‘ফিল্ড’ এবং এক স্বপ্নের মায়াজাল

জয়যাত্রা ডট কম : 03/01/2018

অঘোর মন্ডল : ইংরেজি ভাষা থেকেই ধার করে নিতে হলো শব্দটা। ফিল্ড। ধার করা শব্দ। কিন্তু শব্দটা পরিচিত এবং প্রচলিত। আরও স্পষ্ট করে বলা ভালো, বহুল ব্যবহৃত। বহু কণ্ঠে বহুভাবে উচ্চারিত। আর সেগুলো শুনতে শুনতে মনে হয় অন্যরকম এক ফিল্ডের মধ্যে এখন আমাদের বসবাস। যেখানে আমরা কেউ থাকতে চাই না! ফিল্ড শব্দের তর্জমা করলে দাঁড়ায়Ñ মাঠ। কিন্তু এ দেশের মানুষের কাছে মাঠের চেয়ে ‘ফিল্ড’ বেশি জোরালো, দাবি হিসেবে। দাবিটা অবশ্য এক এক মহল থেকে এক একভাবে উচ্চারিত হয়ে এসেছে। আসছে। আগামীতেও আসবে। সেটা জোর দিয়ে বলা যায়। দায়িত্ব নিয়ে লেখাও যায়।

তবে তার আগে একটা ব্যাখ্যা দেওয়া দরকার। যে শব্দটা বাংলায় আছে, সেটা ইংরেজি থেকে ধার করা কেন লেখার শুরুতে। ব্যাখ্যাটা সহজ। মাঠের চেয়ে ফিল্ড শব্দটা আপামর মানুষের কানে বেশি বাজছে। ক্রীড়া মহল থেকে বলা হচ্ছে ফিল্ড চাই। গ্রিন ফিল্ড। অবশ্য কেউ কেউ এই দাবিটা বাংলায়ও করছেন। মাঠ চাই। খেলার মাঠ। কিন্তু মাঠের সেøাগানটা শুধুই ক্রীড়াঙ্গনে সীমিত। দিনে দিনে সেই মানুষগুলোর কণ্ঠের আওয়াজ ক্ষীণ হয়ে পড়ছে। খেলার মাঠ। সবুজ মাঠ। এসব এখন শুধু বইয়ের পাতায়। একটু বোধহয় ভুল বলা হলো। অযতœ-অবহেলায় কত মাঠ পড়ে আছে। হয়তো তার বুকের রঙ এখন আর সবুজ নেই। ধূসরও নয়। শুধু ধু-ধু বালু! যার ওপর দাঁড়িয়ে আছে বিভিন্ন স্বপ্নের সিটির বিজ্ঞাপনী বিলবোর্ড! অর্থাৎ সবুজ মাঠ হারিয়ে যাচ্ছে। যার মধ্যে আবার জন্ম হচ্ছে বহু মানুষের আগামী দিনের স্বপ্ন। একখ- জমি। যেখানে স্বপ্নের বাড়ি হবে। সেই স্বপ্ন চোখে নিয়ে ধু-ধু বালুর দিকে তাকিয়েও থাকেন অনেকে। বালুর বুকে স্বপ্নের ফেরিওয়ালাদের বিজ্ঞাপন। আর সেটা দেখে আমরা স্বপ্নযাত্রী। স্বপ্নযাত্রীদের স্বপ্ন পূরণের জন্য সরকারের পক্ষ থেকেও বলা হচ্ছেÑ জেলা ছাড়িয়ে প্রতিটা উপজেলায় প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি করে দেওয়া হবে। যার নাম দেওয়া হয়েছে মিনি স্টেডিয়াম। পর্যায়ক্রমে সব উপজেলায় প্লেয়িং ফিল্ড দেওয়ার প্রতিশ্রুতি সরকারের। সেটা পূরণের কিছু ছবিও দেখা যাচ্ছে। বিভিন্ন উপজেলায় মিনি স্টেডিয়ামের সাইনবোর্ড ঝুলছে। কোথাও আবার কাজ চলছে। কোথাও বালু নয়, জলাভূমির ওপর দাঁড়িয়ে থাকা সাইনবোর্ড আগামী দিনের মিনি স্টেডিয়ামের হাতছানি দিচ্ছে এলাকার মানুষকে। হ্যাঁ, সেই মানুষের পরিচয় অভিন্ন নয়। সবাই ক্রীড়াপ্রেমী তাও নয়। অনেকের অনেক পরিচয়। কেউ রাজনীতিবিদ। কেউ ঠিকাদার। কেউ ক্রীড়া প্রশাসনের কর্তা। তাদের দাবি পূরণ হচ্ছে। গ্রিন ফিল্ড তারা দেখতে পাবেন। তবে তার আগে যে যার ফিল্ড থেকে কিছু গুছিয়ে নিতে পারবেন। গ্রিন ফিল্ড, প্লেয়িং ফিল্ড সেটা তো স্বপ্নের শেষ ধাপ। তার আগে যে যার খেলার মাঠে নিজেদের মতো করে খেলে যাচ্ছেন। তার মধ্য দিয়েও কিছু মানুষের একটা দাবি পূরণ হতে পারে। একটা ফিল্ড। খেলার জন্য একটা ফিল্ড চাই। একটা প্লেয়িং ফিল্ড। কিন্তু নির্বাচনী মৌসুম এলে এসব ফিল্ড ব্যবহার হতে পারে অন্য কাজে। যেখানে কোনো ফুটবলারের দুটো পা দেখতে পাবেন না ফুটবল পায়ে। কোনো ক্রিকেটারের দুটো পা দেখতে পাবেন না বল হাতে নিয়ে ছুটতে। কিংবা একটা রানের জন্য ব্যাটসম্যানকে দৌড়াতে। কিন্তু দেখবেন হাজার হাজার পা। যারা নির্বাচনী জনসভাকে জনসমুদ্রে রূপ দিতে ছুটে আসবেন সেই প্লেয়িং ফিল্ডে। স্বপ্নের গ্রিন ফিল্ডে। কারণ এই দেশে রাজনীতি নামের খেলাটার জন্য কোনো বাউন্ডারি লাইন নেই। এর নেই কোনো দৈর্ঘ্য-প্রস্থ! নেই কোনো পরিধি। পরিসীমা। এটা অনেক বড় খেলা। নতুন বছরে বাংলাদেশে রাজনীতি নামের খেলাটার জন্যও মাঠ দরকার পড়বে। অনেকে মাঠ খুঁজছেন। মাঠের দাবি তুলছেন এবং তারাও ব্যবহার করছেন সেই ‘ফিল্ড’ শব্দটাকে। নির্বাচনের জন্য লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডের দাবি তাদের। বিরোধী দলে থাকলে সবাই এই দাবিটা করেন। কারণ বাংলাদেশে গণতন্ত্রের পিলারগুলো যথেষ্ট নড়বড়ে। বিভিন্ন সময় বিভিন্নভাবে সেগুলোকে দুর্বল করা হয়েছে। যারা ক্ষমতায় থেকেছেন কাজটা তারাই করেছেন। আবার বিরোধী দলে গেলে তারা লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডের দাবি করেন! নির্বাচনের আগে রাজনীতির মাঠ থেকে আওয়াজ ওঠে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডের। সেই আওয়াজ যতটা দাবির তার চেয়ে বেশি অভিযোগের। দাবি হলে বলা হতোÑ ‘আমরা নির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড চাই।’ কিন্তু সুরটা যে অন্যরকম। আওয়াজ তোলা হয়, ‘নির্বাচনের জন্য লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নেই।’ কেন নেই তার উত্তর খোঁজার আগে অভিযোগ তোলা হয় সরকারের বিরুদ্ধে। ক্ষমতাসীন দলের কারণে নির্বাচনের মাঠ সমতল থাকছে না! অভিযোগটাকে একেবারে প্রশ্নহীনভাবে উড়িয়ে দেওয়া যাবে না। গণতান্ত্রিক সংগ্রামের মধ্য দিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের দাবি উঠেছিল। অনেক রক্ত, অনেক প্রাণের বিনিময়ে শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশ নামের দেশটার জন্ম হয়েছিল। যার নেতৃত্বে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছিল সেই ভদ্রলোক স্বাধীন দেশে পা রাখার আগে বিদেশের মাটিতে দাঁড়িয়েও বলেছিলেন, ‘আমি বিশ^াস করি ধর্মনিরপেক্ষতায়। আমি বিশ^াস করি গণতন্ত্রে। আমি বিশ^াস করি সমাজতন্ত্রে।’ বঙ্গবন্ধুর সেই বিশ^াসের প্রতিফলন কি খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে সাতচল্লিশ বছরের বাংলাদেশে! যাচ্ছে না। কারণ আমাদের রাজনীতির কারবারিদের কুরাজনীতি। বঙ্গবন্ধুর বিশ^াসের জায়গাগুলো হারিয়ে যেতে বেশি সময় লাগেনি তার স্বপ্নের স্বাধীন বাংলাদেশে। আর তাকে হত্যার মধ্য দিয়ে এ দেশের মানুষের বিশ^াসকে জোর করে নির্বাসনে পাঠানো হয়। ধর্মনিরপেক্ষতাকে ছুড়ে ফেলা হয় ধর্মের নামে বিভাজনের রাজনীতি দিয়ে। গণতন্ত্রকে আরাধ্য করা হয়েছে শুধু সংখ্যাগরিষ্ঠতা আর ক্ষমতার কারণে। সামাজিক ন্যায়বিচারের কথা বলে সমাজতন্ত্র ছুড়ে ফেলা হয়েছে। সাম্যের ভিত্তিতে সমাজের যে চরিত্রটা তৈরি হওয়ার কথা ছিল সেটাও হারিয়ে গেছে। আসলে অসাংবিধানিক ক্ষমতার প্রয়োগ যখন শুরু হলো সেই সময় থেকেই বাংলাদেশ তার চরিত্র হারাতে শুরু করে এবং সেটা বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর থেকেই। গণতন্ত্র এখানে পথমাত্র। গন্তব্য ক্ষমতা। কিন্তু সেই পথের অনেক বিকল্প অনেকে খুঁজে নিয়েছিলেন অনেকভাবে এবং ক্ষমতায় বসেই। রাজনীতিবিদের কাছে তখন নৈতিকতা বলে কিছু ছিল না। এখন আছে সেই দাবিও তারা করতে পারবেন না। আর এ দেশের মানুষের কাছেও রাজনৈতিক অগ্রাধিকার হিসেবে গণতন্ত্র বিবেচিত হয় বলে মনে হয় না। গণতন্ত্র মানে নীতিনৈতিকতা বিসর্জন দিয়ে একদিনের ভোটভুটি আর কাটাকাটি নয়। সেটাই যে দেশের রাজনীতিবিদরা বিশ^াস করতে চান না; তারা মাঝে নির্বাচনী লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডের কথা বলবেন। জনগণ শুনবেন। এই পর্যন্তই। সেই আওয়াজের সঙ্গে গলা মেলাতে খুব একটা উৎসাহী মনে হয় না দেশের মানুষকে। ক্ষমতার স্বার্থ ছাড়া রাজনীতিবিদদের কাছে গণতন্ত্র বলে কিছু আছে কি? নির্বাচনের ফিল্ডটাকে লেভেল করতে দরকার ‘গণতন্ত্রের চর্চা’ নামক রোলার। রাজনীতিবিদরা কি সেই রোলারের ব্যবহার জানেন? নিজেদের দলের মধ্যে গণতন্ত্রের চর্চা নেই। দলের কাউন্সিল যখন হয়, তখন কোনো নেতা-নেত্রীর মুখ থেকে কি লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডের আওয়াজ বের হয়! সেখানে কি কাউন্সিলর বা ডেলিগেটদের ভোটের মাধ্যমে নেতা-নেত্রী নির্বাচিত হচ্ছেন! হচ্ছে না। তাই রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যেই আগে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি করা দরকার। আমাদের রাজনীতিবিদরা সেই ফিল্ড তৈরি করতে ব্যর্থ হয়েছেন। দলের ভেতরে যাদের অবিশ^াস-অসহিষ্ণুতা-অনুদারতায় ভরা তারা ভোটের জন্য লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডের কথা বললে মানুষ হাসে! তবে তার চেয়ে আরেকটু বেশি হাসাহাসি করেন যখন নির্বাচন পরিচালনার জন্য নির্বাচন কমিশনের লোকজন বলেন, সব ঠিক আছে। সবার জন্য নির্বাচনে সমান সুযোগ নিশ্চিত করা হয়েছিল কিংবা হয়েছে। অথবা হবে। লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরির রোলার যাদের হাতে সেই নির্বাচন কমিশন নিজেদের নির্ভীক চরিত্রের প্রমাণ রাখতে পারেন না। নির্ভীকতা প্রমাণে মাঝে মধ্যে তারাও যা করেন, তা প্রহসনে পরিণত হয়। অবাধ-সুষ্ঠু-নিরপেক্ষ নির্বাচন আয়োজনের উদ্দাম-নির্ভীক চর্চা তাদের মধ্যেও নেই। লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি মানে দলে দলে কিছু মানুষকে নির্বাচন কমিশনে ডেকে তাদের সঙ্গে কথা বলা আর কথা শোনা নয়। আরও কিছু। কিন্তু সেই আরও কিছু মানে নির্বাচন কমিশনে মতবিনিময়ের চিত্র টেলিভিশনে প্রচার নয়। পত্রিকার পাতায় নিজেদের সেই কথাগুলো পড়া নয়। গণতন্ত্রের সৌন্দর্যটা যেখানে লুকিয়ে আছে সেটা খুঁজে বের করার দায়িত্ব এ দেশের রাজনীতিবিদ, নির্বাচন কমিশন, রাজনৈতিক দল থেকে সাধারণ মানুষ সবার। নির্বাচন কমিশন সব ঠিক করে দেবে এক দল মানুষ সেই আশায় বসে থাকেন। আরেক দল মানুষ নিজেদের মতো করে সব সাজিয়ে-গুজিয়ে রাখবেন। আর আমজনতা গিয়ে শুধু ভোটযাত্রায় শামিল হবেন। ভোট উৎসব হবে। সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে একদল বা জোট ক্ষমতায় গিয়ে অন্যভাবে গণতন্ত্রের চর্চা করবেন। আর বিরোধী দল সংসদে না গিয়ে বাইরে টেলিভিশনের ক্যামেরা খুঁজবেন নিজেদের কথা জানাতে। এটা কোনোভাবেই গণতন্ত্র চর্চার ক্ষেত্র হতে পারে না। মতবিরোধ-মতানৈক্য আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে নিরসন ঘটাতে হবে। গণতন্ত্র সেই শিক্ষাও দেয়। সেই জায়গায় কারো কণ্ঠে কোনো আওয়াজ নেই! নির্বাচনের জন্য লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড দরকার। এই সত্যকে কেউ অস্বীকার করবেন না। কিন্তু সেই ফিল্ড তৈরির নেতি আবহ থেকে গণতন্ত্র যেন হোঁচট না খায় সেই সংশয় দূর করার দায়িত্ব রাজনীতিবিদদের। উন্নয়ন-সমৃদ্ধি-অগ্রগতি গণতন্ত্রের বিকল্প যেমন নয়, তেমনি নির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরির পথ কখনো জ¦ালাও-পোড়াও, মানুষ হত্যা হতে পারে না। গণতন্ত্রের সুষ্ঠু চর্চাই হচ্ছে নির্বাচনের ফিল্ড লেভেল করার সবচেয়ে ভারী ‘রোলার’। য় অঘোর মন্ডল : সিনিয়র জার্নালিস্ট এবং কলাম লেখক




সর্বশেষ সংবাদ

ব্যবস্থাপনা সম্পাদক: মো. হাফিজউদ্দিন
সম্পাদক - তোফাজ্জল হোসেন
Mob : 01712 522087
ই- মেইল : [email protected]
Address : 125, New Kakrail Road, Shantinagar Plaza (5th Floor - B), Dhaka 1000
Tel : 88 02 8331019