পাঠকের হৃদয়ে আজও হুমায়ূন

জয়যাত্রা ডট কম : 12/02/2018

নিজস্ব প্রতিবেদক : কথার জাদুকর হুমায়ূন আহমেদ না ফেরার দেশে চলে গেছেন ২০১২ সালে। তাকে ছাড়াই ষষ্ঠবারের মতো গ্রন্থমেলা হচ্ছে। কিন্তু মেলায় প্রবেশ করলে যে কারো মনে হবে হুমায়ূন আহমেদ আছেন এবং প্রবলভাবেই আছেন। একুশে গ্রন্থমেলায় হুমায়ূন আহমেদের জনপ্রিয়তাকে এখন পর্যন্ত ছাড়িয়ে যেতে পারেননি কোনো লেখক। গতকাল ১১তম দিনের বিক্রির হিসাব তারই প্রমাণ দিয়েছে। বইপ্রেমীদের হাতে হাতে হুমায়ূন আহমেদের বই তার প্রতি পাঠকের ভালোবাসার প্রতীক হয়ে রয়েছে।
গ্রন্থমেলা ঘুরে দেখা গেছে, স্টলে স্টলে এখনো তার ছবি। থরে থরে সাজানো আছে তার সৃষ্টিকর্ম। ধ্রুবতারার মতোই সত্য- হুমায়ূন আহমেদের বই বিক্রির দিক দিয়ে এখনো সবার শীর্ষে। প্রশ্ন আসতেই পারে- হুমায়ূন আহমেদের নতুন কোনো বই তো নেই, তাহলে কারা পড়ছেন এ সাহিত্যিকের লেখা? উত্তরটা খুবই সহজ, যেসব পাঠক হুমায়ূন আহমেদের অনেক বই পড়েননি তারাই অপঠিত বইগুলো সংগ্রহ করছেন। এ ছাড়া নতুন পাঠকশ্রেণির কাছে হুমায়ূন আহমেদের পুরনো বইগুলোই নতুন। সেই পাঠককুল হুমায়ূন আহমেদকে পড়ছেন, তাকে নতুনভাবে আবিষ্কার করছেন। তাদের হৃদয়ের মণিকোঠায় ঠাঁই দিয়েছেন কালজয়ী এ সাহিত্যিককে। তা ছাড়া পাঠকের কাছে হুমায়ূন আহমেদকে তুলে ধরতে নানা আঙ্গিকে প্রকাশকরা সংকলন ও সমগ্র প্রকাশ করেছেন। সেগুলোও বিক্রি হচ্ছে প্রচুর।
সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে প্রবেশ করলেই দেখা যায় অন্যপ্রকাশের প্যাভিলিয়ন। কার্জন হলের আদলে তৈরি এ প্যাভিলিয়নের কাছাকাছি গেলেই চোখে পড়বে হুমায়ূন আহমেদের ছবি। এখান থেকে প্রকাশিত হয়েছে লেখকের ১২৫টি বই। প্যাভিলিয়নটির সামনে ভিড় লেগেই থাকে। আর এ ভিড়ের কারণ হুমায়ূন আহমেদের বই। অন্যপ্রকাশের মেলা ইনচার্জ সানাউল কবির চৌধুরী কিরণ বলেন, এখনো হুমায়ূন আহমেদের বই সবচেয়ে বেশি বিক্রি হচ্ছে। বেশি বিক্রি হওয়া বইয়ের মধ্যে রয়েছে ‘দেয়াল’, ‘জোছনা ও জননীর গল্প’, ‘মধ্যাহ্ন’, ‘বাদশাহ নামদার’। ‘শঙ্খনীল কারাগার’ ও ‘নন্দিত নরকে’ উপন্যাস দুটির চাহিদা চিরকালের। পাশাপাশি হিমু এবং মিসির আলী সিরিজ তো আছেই।
অন্যপ্রকাশের কর্ণধার মাজহারুল ইসলাম বলেন, কোনো কোনো কথাসাহিত্যিকের মৃত্যুর পর তার সাহিত্য, রচনার আবেদন ফুরিয়ে যায়। পাঠকও একদিন তাকে ভুলে যান, নতুন রচনার অভাবে প্রকাশকরাও ছাপতে চান না নতুন বই। তবে হুমায়ূন স্যার আমাদের সব প্রত্যাশাকে ছাড়িয়ে গেছেন। মৃত্যুর পর তিনি এক নতুন মহিমায় আবির্ভূত হয়েছেন। লোকান্তরে চলে যাওয়া অমর এই কথাসাহিত্যিকের আবেদন যেন আরো বেড়ে গেছে। যে প্রজন্ম কখনো হুমায়ূন আহমেদকে কাছ থেকে দেখেনি, তাদের কাছে তো হুমায়ূন আহমেদ চির নতুন। আজ থেকে আরো অনেক বছর পরেও হুমায়ূন সাহিত্যের আবেদন কখনো ফুরাবে না। তিনি নতুন পাঠকের কাছে থাকবেন চির নতুন। পুরনো পাঠকের কাছে আবির্ভূত হবেন নতুন মাত্রিকতায়।
দেখা গেছে, কাকলী থেকে প্রকাশিত হুমায়ূন আহমেদের শ্রেষ্ঠ হুমায়ূন আহমেদ বইটি বিক্রির শীর্ষে রয়েছে। এ প্রসঙ্গে কাকলীর স্বত্বাধিকারী এ কে নাছির আহমেদ সেলিম বলেন, তাদের প্রকাশিত হুমায়ূন আহমেদের ‘শ্রেষ্ঠ হুমায়ূন আহমেদ’ বইটি এবারের মেলায় বেশি বিক্রি হচ্ছে। তিনি আরো বলেন, হুমায়ূন আহমেদের পাঠক সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। এর কারণ আজ যে পাঠকের জš§ হলো তার কাছে হুমায়ূন আহমেদ এবং তার সৃষ্টিকর্ম নতুন। সেই বইগুলো তারা সংগ্রহ করছেন এবং পড়ছেন।
অনেকেই হুমায়ূন রচনাবলি সংগ্রহ করছেন। হুমায়ূন আহমেদের বইয়ের আরেক প্রকাশনা ‘অবসর’। এখান থেকে প্রকাশ হয়েছে লেখকের ৫০টির অধিক বই। এবার অবসর থেকে প্রকাশ হয়েছে হুমায়ূন আহমেদের ‘সেরা সাত ভৌতিক উপন্যাস’ ও ‘সেরা সাত মুক্তিযুদ্ধের উপন্যাস’। অবসর প্রকাশনার স্বত্বাধিকারী আলমগীর রহমান বলেন, হুমায়ূন আহমেদ যে তার জীবদ্দশায়ই কালজয়ী হয়ে উঠেছিলেন তার প্রমাণ আজ পাওয়া যায়। এখনো তার বই সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয়। এর বিশেষ একটি কারণ আছে। আমাদের মধ্যবিত্ত সমাজের দুঃখ, হাসি, কান্না, আনন্দের কথা এভাবে আর কেউ বলেননি। তার মতো দ্বিতীয় কাউকে আমরা আর পাব না।
প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান ‘কাকলী’ থেকেও হুমায়ূন আহমেদের প্রচুর বই প্রকাশ হয়েছে। এবার এ প্রকাশনী থেকে এসেছে ‘শ্রেষ্ঠ হুমায়ূন আহমেদ’ বইটি। এতে সংকলিত হয়েছে লেখকের ৯টি বহুল পঠিত উপন্যাস ‘নন্দিত নরকে’, ‘শঙ্খনীল কারাগার’, ‘ময়ূরাক্ষী’, ‘মেঘ বলেছে যাবো যাবো’, ‘অপেক্ষা’, ‘লীলাবতী’, ‘কহেন কবি কালীদাস’, ‘মাতাল হাওয়া’ ও ‘বাদশাহ নামদার’। সময় প্রকাশন থেকে প্রকাশ হয়েছে হুমায়ূন আহমেদের ২৮টি বই। প্রকাশনাটির স্বত্বাধিকারী ফরিদ আহমেদ বলেন, পুরনো বইয়ের মধ্যে এখনো হুমায়ূন আহমেদের বইয়ের বিক্রি সবার শীর্ষে। হুমায়ূন আহমেদের বই আরো পাওয়া যাচ্ছে অন্বেষা প্রকাশন ও তাম্রলিপিতে।
মেলায় কথা হয় ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষার্থী সজলের সঙ্গে। কোন লেখকের উপন্যাস পছন্দ জিজ্ঞেস করতে বললেন, হুমায়ূন আহমেদের উপন্যাস আমার প্রথম পছন্দ। আজ ‘হিমুর দ্বিতীয় প্রহর’, ‘তুমি আমায় ডেকেছিলে ছুটির নিমন্ত্রণে’ কিনেছি।
কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ পতœী মেহের আফরোজ শাওন বলেন, হুমায়ূন আহমেদ পুরনো হয়ে যাবেন, এ কথা আমি মানতে নারাজ। নতুন পাঠকের কাছে তিনি সবসময় নতুন, যে পাঠক এখনো হুমায়ূন আহমেদ রচনা পড়েনি, তাদের আগ্রহের শীর্ষে। পুরনো পাঠকদের কথা যদি বলি, তার একটি বই হাতে নিয়ে পুরোটা শেষ না করে সেই বই রেখে দিতে পারি না। তার যেসব বই অসম্ভব জনপ্রিয়তা পেয়েছে, তা কখনো পুরনো হয়নি।
নতুন বই: বাংলা একাডেমির তথ্য অনুযায়ী গতকাল নতুন বই এসেছে ১০২টি। এর মধ্যে কথা প্রকাশ এনেছে সালেক খোকনের ‘আদিবাসী বিয়ে কথা’, আলম তালুকদারের ‘যে ছড়া রবীন্দ্রনাথ লেখে নাই’, বাংলা একাডেমি এনেছে শামসুজ্জামান খানের ‘ফোকলোর সংগ্রহ মালা-১১৫’, রশিদ হায়দারের ‘স্মৃতি: ১৯৯১ প্রথম খণ্ড’, অনুপম এনেছে আনিসুল হকের ‘বঙ্গবন্ধুকে চিঠি ও অন্যান্য’, অনিন্দ্য এনেছে আহমদ রফিকের ‘নির্বাসিত নায়ক’, অনন্যা এনেছে ইমদাদুল হক মিলনের ‘আছো তুমি হৃদয় জুড়ে’, দেশ পাবলিকেশন্স এনেছে লুৎফর হাসানের ‘যে বছর তুমি আমি চাঁদে গিয়েছিলাম’।
মূলমঞ্চের আয়োজন: গতকাল বিকেল ৪টায় গ্রন্থমেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় রুশ বিপ্লবের শতবার্ষিকী শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ইমতিয়ার শামীম। আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন ডা. সারওয়ার আলী ও সৈয়দ আজিজুল হক। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন অধ্যাপক পবিত্র সরকার।
সন্ধ্যায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে আবুল ফারাহ্ মো. তোয়াহার পরিচালনায় সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘কেন্দ্রীয় খেলাঘর আসর’। মুজতবা আহমেদ মুরশেদের পরিচালনায় ‘স্বভূমি লেখক শিল্পী কেন্দ্র’ এবং মো. শহিদুল্লাহর পরিচালনায় ‘সারেগামাপা সঙ্গীত পরিষদ’।
আজকের আয়োজন: আজ সোমবার অমর একুশে গ্রন্থমেলার ১২ম দিন মেলা চলবে বিকেল ৩টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত।
বিকেল ৪টায় গ্রন্থমেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হবে শিক্ষা শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। প্রবন্ধ উপস্থাপন করবেন আবুল মোমেন। আলোচনায় অংশগ্রহণ করবেন রাশেদা কে চৌধুরী, আতিউর রহমান এবং এবং এ. এম. মাসুদুজ্জামান। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করবেন মনজুর আহমেদ। সন্ধ্যায় রয়েছে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।




সর্বশেষ সংবাদ

ব্যবস্থাপনা সম্পাদক: মো. হাফিজউদ্দিন
সম্পাদক - তোফাজ্জল হোসেন
Mob : 01712 522087
ই- মেইল : [email protected]
Address : 125, New Kakrail Road, Shantinagar Plaza (5th Floor - B), Dhaka 1000
Tel : 88 02 8331019