চট্টগ্রাম বন্দরের সর্ব স্তরে ঘুষ

জয়যাত্রা ডট কম : 02/06/2018


নিজস্ব প্রতিবেদক:
চট্টগ্রাম বন্দরে প্রতিটি স্তরে ঘুষ দিতে হয়। ক্ষেত্রবিশেষে ১০ হাজার থেকে ৫-১০ লাখ টাকা পর্যন্তঘুষ দিতে হয়। ঘুষ ছাড়া কোনো কাজ হয় না। আবার ঘুষ দিয়েও মুক্তি মেলে না। ঘাটে-ঘাটে হয়রানির শিকার হচ্ছেন সেবাগ্রহীতারা।
চট্টগ্রাম বন্দরের সেবা নিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) এক জরিপে ঘুষ, দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার এই চিত্র উঠে এসেছে। দুদক কমিশনার (অনুসন্ধান) ড. নাসিরউদ্দীন আহমেদ জরিপে পাওয়া বিষয়গুলো নিয়ে বন্দর কর্তৃপক্ষ ও কাস্টম হাউস কমিশনারের সঙ্গে আলোচনা করেছেন। তাদের হয়রানিমুক্ত মানসম্মত সেবা দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
নাসিরউদ্দীন আহমেদ বলেন, চট্টগ্রাম বন্দরের সর্বত্র দুর্নীতি। বন্দর পরিচালনা পদ্ধতি যথাযথভাবে কাজ করছে না। বন্দর ও কাস্টমসের মধ্যে রয়েছে সমন্বয়ের অভাব। এ কারণে সেবাগ্রহীতারা প্রতিনিয়ত দুর্নীতি ও হয়রানির শিকার হচ্ছেন। তারা দুর্নীতিমুক্ত সেবা পাচ্ছেন না। প্রতি মাসে বন্দর ও কাস্টমস কর্তৃপক্ষকে সমন্বয় সভা করে সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে সেগুলো সমাধান করতে হবে। তিনি আরও বলেন, দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত বন্দর ও কাস্টমস কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ পাওয়া গেলে তদন্ত করে তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
দুদকের জরিপে বন্দর ও কাস্টম হাউসের কর্মকতা-কর্মচারীদের স্বেচ্ছাচারিতা, অনিয়ম ও দুর্নীতির তথ্য মিলেছে। জরিপে বলা হয়, আধুনিক যুগেও সেকেলে যন্ত্রপাতি ও তথ্যপ্রযুক্তি দ্বারা চলছে কার্যক্রম। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অদক্ষতার কারণে সময়ক্ষেপণ হচ্ছে। পর্যাপ্ত জনবলের অভাবও সংকটের অন্যতম কারণ।
সূত্র জানায়, চট্টগ্রাম বন্দর ও কাস্টম হাউসে হয়রানিমুক্ত উন্নত সেবা নিশ্চিত করা, বাণিজ্যের অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করা ও রাজস্ব আয় বৃদ্ধির লক্ষ্যে দুদকের পক্ষ থেকে ওই জরিপে সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট, ফ্রেইট ফরওয়ার্ডার্স, রফতানিকারক ও আমদানিকারকদের মতামত গ্রহণ করা হয়। তারা দেশের উন্নয়ন নিশ্চিত করতে বন্দরের দক্ষতা বৃদ্ধি ও স্বল্পসময়ে উন্নত সেবা নিশ্চিত করার দাবি জানান।
নানা কাজে সরকারি ফি ছাড়া বাড়তি টাকা নেওয়া হয় কি-না? নেওয়া হলে কোন পর্যায়ে কত টাকা দিতে হয়- জরিপের এই প্রশ্নের জবাবে ৮৩ শতাংশ মানুষ বলেছে, বিভিন্ন কাজের দলিলাদি নোটিং থেকে পণ্য খালাস পর্যন্ত প্রতিটি স্তরে ঘুষ দিতে হয়। ঘুষের টাকা সুনির্দিষ্ট করা নেই। বিভিন্ন জনের কাছ থেকে নানা হারে আদায় করা হচ্ছে।
ক্ষেত্রবিশেষে বন্দর ও কাস্টম হাউসে ১০ হাজার থেকে ৫-১০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুষ দিতে হয় বলে জানিয়েছেন ৬২ শতাংশ মানুষ। ৪৮ শতাংশ মানুষ জানায়, পরীক্ষাগার, শুল্ক্কায়ন ও বন্দরের সোনালী ব্যাংক শাখায় অতিরিক্ত টাকা প্রদান করতে হয়। মালপত্র ডেলিভারি পেতে দিতে হয় অতিরিক্ত টাকা। টাকা না দিলে ডেলিভারি বিলম্ব হয় বলে জানিয়েছে ৪৮ শতাংশ সেবাগ্রহীতা।
কোন পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারী দ্বারা হয়রানির শিকার হচ্ছেন- এই প্রশ্নের জবাবে ৮২ শতাংশ মানুষ বলেছেন, সেবাগ্রহীতারা বন্দর ও কাস্টমসের প্রায় সব পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারী দ্বারা হয়রানির শিকার হচ্ছেন। শুল্ক্ক নেওয়ার সময় সোনালী ব্যাংক কর্মকর্তা-কর্মচারীরা হয়রানি করছেন বলে জানান ৭৮ শতাংশ মানুষ। এ ছাড়া অদক্ষ ফর্ক লিফট ও ক্রেন ড্রাইভার, পণ্য পরীক্ষার সময় ডিসি, এসি, এআইআরের যথাসময়ে উপস্থিত না হওয়া, মালপত্র ডেলিভারি পর্যায়ে হাইস্টার, ক্রেন, এস/সি অপারেটরদের অসহযোগিতা, পণ্যের শুল্ক্কায়নে হঠাৎ ফাইল করার প্রবণতার কারণে হয়রানির শিকার হচ্ছেন সেবাগ্রহীতারা।
৯০ শতাশ মানুষ বলেছেন চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউসের সার্ভারের ধীরগতির কারণে সময় অপচয় হয়। হাইস্টার ও ক্রেন অপারেটরদের অসহযোগিতার কথা বলেছেন ৮৬ শতাংশ। কয়েকটি পর্যায়ে অহেতুক পণ্য পরীক্ষা করে সময় নষ্ট করার কথা জানিয়েছেন ৮৫ শতাংশ মানুষ।
অন্য সমস্যাগুলো হলো- ঘুষ ছাড়া বন্দর ও কাস্টম হাউসের ডকুমেন্ট নড়াচড়া করে না। বন্দর ইয়ার্ডে কনটেইনার জট, পর্যাপ্ত যন্ত্রপাতি না থাকার কারণে সময় অপচয় হচ্ছে। বন্দর, কাস্টম হাউস ২৪ ঘণ্টা খোলা থাকলেও সংশ্নিষ্ট শিপিং এজেন্ট অফিস, ব্যাংক বিকেল ৫টায় বন্ধ হওয়ায় ডেলিভারি রিপোর্ট পেতে সমস্যা হচ্ছে। বন্দরে বার্থিং পেতে অতিরিক্ত সময় ব্যয় হচ্ছে ও হয়রানি করা হচ্ছে। পণ্যের আর্ট নম্বর, কেমিক্যালের নাম, সংজ্ঞা ইত্যাদির ব্যাপারে আরও/এআরওদের ধারণা না থাকায় সময়ের অপচয় হচ্ছে।
জরিপে আমদানি পণ্য খালাসে বন্দর ও কাস্টমসে বাধা সম্পর্কে নানা তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের সার্ভার ত্রুটি, বাণিজ্যিক ব্যাংকের একটি মাত্র শাখা, কাস্টম হাউসের রাসায়নিক পরীক্ষাগারের কর্মকর্তাদের স্বেচ্ছাচারিতা, দুর্নীতি, জাহাজ বহির্নোঙর থেকে বার্থিং পেতে সমস্যা, ভৌত ও রাসায়নিক পরীক্ষায় সময়ক্ষেপণ, বন্দরে এলসিএল কনটেইনারের ভিত্তিতে আমদানিকৃত পণ্য আনস্টাফিংয়ে সময়ক্ষেপণ, বন্দর ও কাস্টমসে পর্যাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারী ও শ্রমিক না থাকা, শিপিং এজেন্টদের স্বেচ্ছাচারিতা ও সব ক্ষেত্রে ঘুষ দাবির কারণে অস্থির সেবাগ্রহীতারা। ওইসব সমস্যার কথা জানিয়েছেন ৬০ থেকে সর্বোচ্চ ৮৪ শতাংশ মানুষ।
রফতানি পণ্য শিপমেন্টের ক্ষেত্রে নানা সমস্যার কথা জানিয়েছেন ৭৮-৮৬ শতাংশ মানুষ। সমস্যাগুলোর মধ্যে কাস্টমস সার্ভারে ইএক্সপি ফরম-সংক্রান্ত তথ্য যথাসময়ে না পাওয়া, রফতানি পণ্য শিপমেন্টের সময় টাকা ছাড়া ডকুমেন্টস-সংক্রান্ত শুল্ক্কায়ন সম্ভব হয় না। আইসিডিতে পণ্য সময়মতো আনলোড না হওয়া ও বন্দরের বিভিন্ন স্থানে হয়রানি ও সময়ক্ষেপণের কারণে যথাসময়ে পণ্য জাহাজিকরণ সম্ভব হয় না।
জরিপে সেবা সহজীকরণে ৯টি সুপারিশ পাওয়া গেছে। এগুলো হলো- কাস্টমস ডাটার স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতির সফটওয়্যার (অংুপঁফধ ডড়ৎষফ) সার্ভার আধুনিকায়ন করা, কাস্টম হাউসের নিজস্ব সার্ভার স্থাপন করা, চট্টগ্রাম বন্দরে হাইস্টার ও ক্রেন অপারেটরদের কাজের তদারকি জোরদার করা, বন্দরে পর্যাপ্ত ইকুইপমেন্ট নিশ্চিত করা, শুল্ক্কায়ন-সংক্রান্ত প্রতিটি শাখায় জনবল বৃদ্ধি করা, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের তদারকি জোরদার করা, বন্দর ও কাস্টম হাউস-সংশ্নিষ্ট আগ্রাবাদ এলাকার সব ব্যাংক ও শিপিং এজেন্টের অফিস সপ্তাহের সাত দিন ও রাত ৮টা পর্যন্ত খোলা রাখার ব্যবস্থা করা, অনলাইনে সব দপ্তরের পরিদর্শন সার্টিফিকেট পাওয়ার ব্যবস্থা করা, সৎ, দক্ষ ও যোগ্য কর্মকর্তার মাধ্যমে পণ্য নোটিং করা, ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে পণ্য ডেলিভারির ব্যবস্থা করা ও প্রতিটি বিভাগে আলাদা মনিটরিং সেল গঠন করা।

সূত্র: সমকাল




সর্বশেষ সংবাদ

ব্যবস্থাপনা সম্পাদক: মো. হাফিজউদ্দিন
সম্পাদক - তোফাজ্জল হোসেন
Mob : 01712 522087
ই- মেইল : [email protected]
Address : 125, New Kakrail Road, Shantinagar Plaza (5th Floor - B), Dhaka 1000
Tel : 88 02 8331019