মতাদর্শের বিরোধে শাহজাহান খুন, ধারণা স্বজন ও পুলিশের

জয়যাত্রা ডট কম : 13/06/2018


ডেস্ক রিপোর্ট: মুক্তমনা লেখক, প্রকাশক শাহজাহান শাহজাহানকে মতাদর্শের বিরোধ থেকে হত্যা করা হয়েছে বলে ধারণা করছেন তার পরিবারের সদস্যরা। একই ধারণা মুন্সীগঞ্জের পুলিশ এবং ঢাকার পুলিশের জঙ্গি প্রতিরোধে গঠিত বিশেষায়িত ইউনিট কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিটের (সিটিটিসি)।

শাহজাহান বাচ্চু কয়েক বছর ধরেই ধর্মীয় বিষয় নিয়ে বিশ্লেষণধর্মী লেখালেখি করার কারণে উগ্রপন্থীদের হুমকি পেয়ে আসছিলেন। তিনি পরিবার-স্বজন ও বন্ধুদের সবসময় বলতেন, যেকোনও সময় তিনি উগ্রপন্থীদের টার্গেট হতে পারেন। এ কারণে ঢাকার বাসা ছেড়ে মুন্সীগঞ্জের সিরাজদিখানে গ্রামের বাড়িতে থাকা শুরু করেছিলেন তিনি। এমনকি গত মার্চে তিনি স্থায়ীভাবে ভারতে থাকার জন্য চেষ্টাও করেছিলেন। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে গিয়ে ১৩ দিনের মাথায় ফিরে আসেন তিনি।

তবে এত হুমকি পেলেও তিনি থানা পুলিশের কাছে নিজের নিরাপত্তা চাননি। শাহজাহানের বন্ধু ও স্বজনরা বলছেন, তিনি মনে করতেন তার গ্রামে গিয়ে কেউ তাকে আক্রমণ করতে পারবে না। এলাকায় তিনি সঙ্গী-সাথী নিয়েই সবসময় চলাফেরা করতেন। মুন্সীগঞ্জের পুলিশ সুপার (এসপি) জায়েদুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা জঙ্গিদের বিষয়টিসহ অন্যান্য বিষয় মাথায় রেখে অনুসন্ধান শুরু করেছি। কারা এবং কেন তাকে হত্যা করলো তা খুঁজে বের করার চেষ্টা চলছে। আশা করি, খুব শিগগির এই হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটন করা সম্ভব হবে।’

গত সোমবার বিকালে সিরাজদিখানের পূর্ব কাকালদি গ্রামের ছোট্ট একটি বাজারের একটি ফার্মেসিতে বসে আড্ডা দিচ্ছিলেন শাহজাহান। সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে ফার্মেসি থেকে বেরিয়ে পাশের একটি মুদি দোকানে যাওয়ার সময় সড়কের ওপরেই তাকে কাছ থেকে গুলি করে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। দুটি মোটরসাইকেলে আসা চার দুর্বৃত্ত হত্যার পর বোমা ফাটিয়ে এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পালিয়ে যায়। খবর পেয়ে স্থানীয় পুলিশ কর্মকর্তারাসহ ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি আব্দুল্লাহ আল মামুন এবং সিটিটিসির একটি দল ঘটনাস্থলে ছুটে যায়।

মঙ্গলবার সকালে সিরাজদিখানের কাকালদি গিয়ে দেখা যায়, তিন রাস্তার মিলনস্থল ছোট্ট ওই বাজারটিতে থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে। র‌্যাব-পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থার লোকজন তথ্য সংগ্রহের জন্য প্রত্যক্ষদর্শীদের সঙ্গে কথা বলছেন। যে মুদি দোকানের সামনে শাহজাহান বাচ্চুকে গুলি করে হত্যা করা হয়, তার মালিক নাহিদ হোসেন জানান, ইফতারের আগ মুহূর্তে তিনি ইফতার তৈরি করছিলেন। সে সময় দোকানে কয়েকজন গ্রাহকও দাঁড়িয়ে ছিলেন। সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে হঠাৎ একাধিক গুলির শব্দ পান। পর মুহূর্তেই আবারও বিকট শব্দ হয়, সঙ্গে ধোঁয়াচ্ছন্ন হয়ে যায় সামনের সড়ক। লোকজন চিৎকার, চেঁচামেচি ও ছোটাছুটি করতে থাকে। কয়েক মিনিট পর তিনি দোকান থেকে বেরিয়ে রাস্তায় শাহজাহানকে রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখেন। সঙ্গে সঙ্গে তিনি দোকান বন্ধ করে ফেলেন।

নাহিদ বলেন, ‘সবকিছু যেন দুই মিনিটের মধ্যে ঘটে গেলো। কারা এসে গুলি করলো আমি তা দেখতে পারিনি। তবে পরে শুনেছি, দুটি মোটরসাইকেলে চারজন লোক এসেছিল। তাদের মাথায় হেলমেট ছিল।’

হত্যাকাণ্ডের আগে যে ফার্মেসিতে বসে ছিলেন শাহজাহান বাচ্চু, তার মালিক ডা. আনোয়ার হোসেন আনুকে ঘটনার পর পুলিশ দীর্ঘ সময় নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে। মধ্যরাতে তাকে ছেড়ে দেওয়া হলেও মঙ্গলবার সকালে তাকে আবারও থানায় নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করেন ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তারা।

আনোয়ার হোসেনের স্ত্রী আসমা আক্তার জানান, রাতে তার স্বামী তাকে বলেছেন, ঘটনার দিন বিকালে তাকে ফোন দিয়েছিলেন শাহজাহান। পরে তিনি ফার্মেসিতে এলে তারা বসে গল্প করছিলেন। এক পর্যায়ে শাহজাহান বাচ্চু পাশের দোকানের দিকে যেতেই গুলি করা হয়। যে দুজন গুলি করেছে ও বোমা ফাটিয়েছে তাদের মাথায় হেলমেট ছিল। পরে দ্রুত তারা মোটরসাইকেলে করে পালিয়ে যায়।

ওই বাজারের আরেক মুদি দোকানি মজিবর রহমান বলেন, ‘ইফতারের আগে বাজারে অন্তত ৫০-৬০ জন লোক ছিল। রাস্তার পাশেই লোকজন ক্যারাম বোর্ড খেলছিল। সন্ত্রাসীরা গুলি করার পর সবাই দৌড়াদৌড়ি শুরু করে। এরপর সন্ত্রাসীরা বোমা ফাটিয়ে চলে যায়। ২-৩ মিনিটের মধ্যে সবকিছু শেষ হয়ে যায়। সন্ত্রাসীরা চলে গেলে দোকানদাররা সব দোকান বন্ধ করে ফেলেন। পরে রাস্তায় শাহজাহানকে পড়ে থাকতে দেখে সেখানে সবাই ভিড় করেন। ততক্ষণে তিনি মারা গিয়েছিলেন।’

কেন হত্যা করা হলো শাহজাহানকে?

মুক্তমনা লেখক ও প্রকাশক শাহজাহান বাচ্চু একসময় রাজধানীর বাংলাবাজারে বিশাকা প্রকাশনী নামে একটি প্রকাশনা সংস্থা চালাতেন। কয়েক বছর ধরে এটি বন্ধ রয়েছে। শুদ্ধচর্চা কেন্দ্র নামে একটি সংগঠনও চালাতেন তিনি। এছাড়া, ধর্ম নিয়ে ফেসবুকে লেখালেখি করতেন। এসব কারণে কয়েক বছর ধরেই উগ্রপন্থীরা তাকে বিভিন্নভাবে হুমকি দিয়ে আসছিল। কাকালদি গ্রামে বসবাস করা শাহাজহান বাচ্চুর দ্বিতীয় স্ত্রী আফসানা জাহান বলেন, তার স্বামী আগে ঢাকায় থাকলেও হত্যার হুমকির কারণে ৩ বছর ধরে গ্রামেই স্থায়ীভাবে থাকা শুরু করেন। মাঝেমধ্যেই তিনি তাকে যেকোনও সময় মেরে ফেলা হতে পারে এমন কথা বলতেন। তার সেই আশঙ্কাই সত্যি হলো। আফসানা জাহানের ধারণা, লেখালেখি সংক্রান্ত বিরোধের কারণেই হয়তো মৌলবাদীরা তার স্বামীকে হত্যা করেছে।

শাহজাহান বাচ্চুর দ্বিতীয় স্ত্রীর ঘরের দুই ছেলে মেয়ে আঁচল জাহান ও বিশাল জাহানেরও ধারণা, ফেসবুকে ধর্ম নিয়ে লেখার কারণে তাদের বাবাকে হত্যা করা হয়েছে। বাড়িতে তাদের কাছে এসব বিষয় বলতেন। বাড়ির সঙ্গেই আলাদা একটি টিনশেড ঘরে ঘুমাতেন তাদের বাবা। হুমকির কারণে দিন পনের আগে মূল বাড়িতে থাকা শুরু করেছিলেন তিনি।

নিহত শাহজাহানের প্রথম স্ত্রী লুৎফা জাহান থাকেন তার ঢাকার ডেমরার বাসায়। বিপাশা ও দূর্বা নামে সেই ঘরে দুই কন্যা রয়েছে তার। দূর্বা জাহান বলেন, তার বাবার সঙ্গে সম্পত্তি বা অন্য কিছু নিয়ে কারও কোনও শত্রুতা ছিল না। তারও ধারণা, লেখালেখির কারণেই তার বাবাকে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে।

শাহজাহান বাচ্চুর নিয়মিত আড্ডার সঙ্গী গ্রাম সম্পর্কে ভাগ্নে আনিসুর রহমান জানান, শাহজাহান বাচ্চু তাদের কাছেও নিয়মিত জীবন নিয়ে হুমকির কথা বলতেন। ফেসবুকে কারা তাকে হুমকি দিচ্ছে, তা দেখাতেনও। তবু তারা বিশ্বাস করতে পারেননি বাড়ির কাছেই কেউ তাকে হত্যা করতে পারে। আনিসুর রহমান বলেন, ‘মামা সবসময় বলতেন–দেখো, পরবর্তী টার্গেট কিন্তু আমি। এজন্য রাতের বেলা চলাচল করতে আমরা সবসময় কয়েকজন মামার সঙ্গে থাকতাম। কিন্তু দিনের বেলায় এমন ঘটনা ঘটতে পারে বলে আমাদের কল্পনাতেও ছিল না। লেখালেখির কারণেই জঙ্গিরা তাকে হত্যা করেছে।’

ক্ষোভ প্রকাশ করে শাহজাহান বাচ্চুর অনুসারী এক সময়ের প্রবাসী আনিসুর রহমান বলেন, ‘শাহজাহান মামা তো যৌক্তিক বিষয়ে লেখালেখি করতেন। কারও যদি আপত্তি থাকে, তবে লিখেই তার প্রতিবাদ করতে পারতো। কাউকে হত্যা করাটা তো উচিত নয়।’

খুনিরা আগেই রেকি করেছিল

শাহজাহান হত্যাকাণ্ডের রহস্য অনুসন্ধানকারী পুলিশ ও বন্ধু-স্বজনরা বলছেন, খুনিরা তাকে হয়তো আগে থেকেই অনুসরণ করছিল। মনির হোসেন নামে শাহজাহান বাচ্চুর এক প্রতিবেশী জানান, সোমবার বিকাল ৩টার দিকে তিনি কাকালদি কমিউনিটি ক্লিনিকের সামনের সেতুতে একটি মোটরসাইকেল ও তিনজন ব্যক্তিকে দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেন। তারা এমন জায়গায় বসেছিলেন যেখান থেকে শাহজাহান বাচ্চুর বাড়ি থেকে বের হওয়ার রাস্তা দেখা যায়। মনির হোসেনের ধারণা, লাল মোটরসাইকেল নিয়ে যারা বসেছিল, তারা খুনি চক্রের কেউ হতে পারে।

কয়েক মাস ধরেই মাঝে মধ্যে ওই সেতুতে মোটরসাইকেলে করে শার্ট-প্যান্ট পরা অচেনা লোকজনকে বসে থাকতে দেখেছেন তিনি। আগে তারা ধারণা করেছিলেন, তারা গোয়েন্দা সংস্থার লোকজন হতে পারে। এখন মনে হচ্ছে উগ্রপন্থী দলের সদস্য। তারাই হয়তো শাহজাহানের বাসা থেকে বের হয়ে ফার্মেসিতে যাওয়ার কথা জানিয়েছে।

নিহত শাহজাহানের এক স্বজন জানান, খুনের আগে যে ফার্মেসিতে বসেছিলেন শাহজাহান, তার মালিক আনু ডাক্তারের সঙ্গে সপ্তাহখানেক ধরে মনোমালিন্য চলছিল তার। এক সপ্তাহ পর সোমবারই তিনি ওই ফার্মেসিতে যান। খুনিরা আগে থেকেই অনুসরণ না করলে শাহজাহান বাচ্চুর অবস্থান তাদের জানার কথা ছিল না।

আতঙ্কে ভারতে চলে যেতে চেয়েছিলেন শাহজাহান

খুনের আতঙ্ক মাথায় নিয়ে ঘুরে বেড়ানো শাহজাহান বাচ্চু ভারতে গিয়ে স্থায়ী হওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন। এজন্য তিনি গত ১৭ মার্চ কলকাতায় গিয়েছিলেন। যাওয়ার আগে তিনি স্ত্রী-সন্তানদের বলে গিয়েছিলেন, তিনি সেখানে থেকে যাওয়ার চেষ্টা করবেন। কিন্তু ৩১ মার্চ ফিরে আসেন।

তার স্ত্রী আফসানা জাহান বলেন, ‘দেশে থাকলে তাকে খুন করা হতে পারে মনে করে তিনি ভারতে থাকার কথা বলেছিলেন। কিন্তু কী মনে করে আবার চলে আসলেন তা আমাদের বিস্তারিত কিছু বলেননি। কিন্তু সবসময় ভয়-আর আতঙ্ক নিয়ে থাকতেন। আমরা তাকে লেখালেখি বন্ধ করার কথা অনেকবার বলেছি; তিনি তা শুনতেন না।’

শাহজাহান বাচ্চুর সবসময়ের সঙ্গী আনিসুর রহমান জানান, ভারতে এক বছরের ভিসা পেয়েছিলেন শাহজাহান বাচ্চু। তিন মাস থেকে তারপর রাজনৈতিক আশ্রয়ের চেষ্টা করবেন এমন পরিকল্পনা ছিল তার। কিন্তু আবার স্ত্রী-সন্তান রেখে ভারতে পালিয়ে থাকাটাকেও কাপুরুষতা মনে করতেন তিনি। এজন্যই তিনি ১৩ দিনের মাথায় আবার দেশে ফিরে আসেন।

হত্যার নেপথ্যে উগ্রপন্থীদের কোন দল?

পুলিশ ও স্বজনরা প্রাথমিকভাবে ধারণা করছেন, মতাদর্শগত কারণে শাহজাহান বাচ্চুকে হত্যা করা হয়েছে। হত্যার ধরণ দেখে পুলিশ কর্মকর্তারা জঙ্গি সম্পৃক্ততার বিষয়ে জোর দিয়ে খতিয়ে দেখা শুরু করেছেন।

গোয়েন্দা কর্মকর্তারা বলছেন, ধর্ম নিয়ে সমালোচনাকারীদের নাস্তিক আখ্যায়িত করে তাদের হত্যার জন্য টার্গেট করে সাধারণত আল কায়েদা ইন ইন্ডিয়ান সাব-কন্টিনেন্ট (একিউআইএস) এর বাংলাদেশের অনুসারী আনসার আল ইসলাম। কিন্তু বাংলাদেশে তারা ২০১৩ সালের প্রথম থেকে যেসব হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে, তার সবগুলোতেই ছুরি দিয়ে আক্রমণ করা হয়েছে।

অন্যদিকে, মধ্যপ্রাচ্যের জঙ্গিগোষ্ঠী ইসলামিক স্টেটের (আইএস) এদেশীয় অনুসারী নিও জেএমবির সদস্যরা বিভিন্ন সময়ে গুলি করে হত্যার ঘটনা ঘটিয়েছে। তবে ধর্ম নিয়ে সমালোচনাকারীদের চেয়ে ভিন্ন ধর্মালম্বী ও বিদেশিরা ছিল তাদের প্রধান টার্গেট।

জঙ্গিবাদ নিয়ে দীর্ঘ সময় ধরে কাজ করা সিটিটিসির একজন কর্মকর্তা জানান, যে গোষ্ঠীই হোক, জঙ্গিরা হয়তো নতুন করে আবার তাদের অস্তিত্ব জানান দেওয়ার চেষ্টা করছে। এটি হয়তো শাহজাহান বাচ্চুকে দিয়েই শুরু হলো। কোণঠাসা জঙ্গি সংগঠন দুটি মিলে গেছে কিনা তাও তারা খতিয়ে দেখছেন। সূত্র: বাংলা ট্রিবিউন




সর্বশেষ সংবাদ

ব্যবস্থাপনা সম্পাদক: মো. হাফিজউদ্দিন
সম্পাদক - শরিফা নাজনীন
Mob : 01712 522087
ই- মেইল : [email protected]
Address : 125, New Kakrail Road, Shantinagar Plaza (5th Floor - B), Dhaka 1000
Tel : 88 02 8331019