বিপর্যস্ত চট্টগ্রামের জনজীবন

জয়যাত্রা ডট কম : 13/06/2018


চট্টগ্রাম প্রতিনিধি : টানা বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে চট্টগ্রাম মহানগরী ও অন্য উপজেলাগুলোতে বন্যা দেখা দিয়েছে। পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন চট্টগ্রাম মহানগরের কয়েক লাখ লোক। একই অবস্থা জেলার অন্য উপজেলাগুলোতেও। ঘর থেকে বের হওয়া যাচ্ছে না।

বের হলেই আবার ফেরার নিশ্চয়তা নেই। গত দুদিন বাসায় সাহরি খাওয়া হচ্ছে না রোজাদারদের। বিদ্যুৎ নেই ঘণ্টার পর ঘণ্টা। পানি ঢুকে পড়ার কারণে বহু বাসাবাড়িতে রান্নাও হচ্ছে না। ঘরের মধ্যেই কোমর পরিমাণ পানি।
মৌসুমের প্রথম অবিরাম বর্ষণে ভয়াবহ অবস্থা বিরাজ করছে নগর ও উপজেলাজুড়ে। জেলার হাটহাজারী, ফটিকছড়ি, রাউজান, রাঙ্গুনিয়া, বোয়ালখালী, আনোয়ারা, বাঁশখালী, চন্দনাইশ, সীতাকুণ্ড ও মিরসরাই উপজেলায় ভয়াবহ বন্যায় রূপ নিয়েছে। এসব উপজেলাগুলোতে এক দিকে প্রবল বর্ষণ অন্য দিকে পাহাড়ি ঢল এবং বন্যার পানিতে ঘরবাড়ি, হাটবাজার, অফিস-আদালতসহ সবকিছুই ডুবে গেছে।
নগরের হালিশহর, আগ্রাবাদ, এশিয়ান হাইওয়ের ষোলশহর ২নং গেট থেকে মুরাদপুর, চান্দগাঁও, চকবাজার, কাপাসগোলা, বাদুরতলা, কেবি আমান আলী রোড, খাজা রোড, পবর্তক মোড়, আগ্রাবাদ সোনালী ব্যাংক কলোনি, সিডিএ, মুহুরিপাড়া, দাইয়া পাড়া, শান্তিবাগ ছোট পুল এবং বাকলিয়ার বিভিন্ন অংশে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। গত রোববার রাত থেকে এসব এলাকায় বৃষ্টি বন্ধ হলে পানি কমে, আবার বৃষ্টি শুরু হলে পানি বেড়ে যায়। এ অবস্থাতেই রয়েছে ওসব এলাকার বাসিন্দারা। আগ্রাবাদ মা ও শিশু হাসপাতালে হাঁটু পানি জমে আছে দুদিন ধরে।
চট্টগ্রাম আবহাওয়া অধিদপ্তর জানায়, উত্তর-পূর্ব বঙ্গোপসাগর ও তৎসংলগ্ন এলাকায় অবস্থানরত সুস্পষ্ট লঘুচাপটি আরও উত্তর-উত্তরপূর্ব দিকে অগ্রসর ও ঘনীভূত হয়ে মৌসুমি নিম্নচাপে রূপ নিয়েছে। নিম্নচাপটি আরও উত্তর, উত্তর-পূর্বদিক থেকে অগ্রসর হয়ে গত রোববার মধ্য রাতের দিকে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের ওপর দিয়ে বাংলাদেশের উপকূল অতিক্রম করেছে। এ কারণে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, মংলা ও পায়রা সমুদ্রবন্দরে তিন নম্বর স্থানীয় সতর্ক সংকেত বহাল রেখেছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। পাশাপাশি ভারী বর্ষণের সঙ্গে চট্টগ্রাম বিভাগের বিভিন্ন স্থানে পাহাড়ধসের আশঙ্কা করছে আবহাওয়া অধিদপ্তর।
গত সোমবার বিকালে পানির স্রোত থেকে বাঁচতে ছয় ব্যক্তি গাছের ওপর আশ্রয় নিয়েছেন। পরে তাদের উদ্ধার করেছে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা। পাহাড়ি ঢলের স্রোতে ওই এলাকায় আগে থেকে অবস্থান করা ছয়জন আটকে পড়েন। এদিকে উপজেলার বিভিন্ন নিচু এলাকা পানির নিচে তলিয়ে আছে বলে দৌলত জানান।
ফটিকছড়ি ও নাজিরহাট পৌরসভাসহ ১৪ ইউনিয়ন প্লাবিত হয়েছে। দুদিনে পানিবন্দি হয়েছে হাজারো পরিবার। অনেকের হাতে টাকা থাকলেও তারা অসহায়। বেশিরভাগ ইউনিয়নের সড়কে কোমরপানি। পাহাড়ি ঢলে ভেঙে গেছে সড়ক। উপজেলার নারায়ণহাট, ভুজপুর, হরারুয়ালছড়ি, সুয়াবিল, পাইন্দং, লেলাং, রোসাংগিরি, নানুপুর, বক্তপুর, ধর্মপুর, জাফতনগর, সমিতিরহাট, আবদুল্লাহপুর, ফটিকছড়ি ও নাজিরহাট পৌর এলাকার হাজারো পরিবার পানিবন্দি। পাহাড়ি ঢল ও বৃষ্টির পানির স্রোতে ভেসে গেছে পুকুর-দীঘি, মাছের খামারের মাছ। মুরগির খামার ও গৃহপালিত পাখি এবং গবাদিপশু চরম বিপাকে। বন্ধ রয়েছে অভ্যন্তরীণ সড়কগুলোর যান চলাচলও।
ফায়ার সার্ভিসের চট্টগ্রাম নিয়ন্ত্রণ কক্ষ থেকে অপারেটর রুহুল আমিন জানান, কয়েক দিনে প্রবল বর্ষণে ফটিকছড়ির কাঞ্চন নগর এলাকা পানির নিচে তলিয়ে গেছে। এলাকাটি ডুবে গেলে কয়েকজন পাহাড়ি ঢলের স্রোতের মধ্যে পড়ে যান। এ সময় তারা কোনোভাবে গাছের উওপরে আশ্রয় নেন। ওই এলাকার দুপাশে নদী থাকার কারণে এমনটা হয়েছে বলে নিয়ন্ত্রণ কক্ষে বার্তা আসে ফটিকছড়ি থেকে। পরে কলাগাছের ভেলা বানিয়ে তাদের উদ্ধার করে ফায়ার সার্ভিসের উদ্ধার কর্মীরা।
রাউজান থেকে আরাফাত হোসাইন জানান, প্রবল বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলের চাপে ভেঙে গেছে রাউজানে হলদিয়া ইউনিয়নের পূর্ব ডাবুয়া খালের ওপর নির্মিত ব্রিজ। এতে ওই এলাকার কয়েক হাজার মানুষের যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। গত সোমবার বিকালের দিকে ব্রিজটি দ্বি-খণ্ডিত হয়ে খালের মধ্যেই পড়ে যায়।
আরাফাত হোসেন বলেন, ওই ব্রিজটি রাউজান সদরের সঙ্গে বিশাল একটি জনপদের একমাত্র যোগাযোগের মাধ্যম ছিল। তবে ব্রিজটি ভেঙে যাওযার পর চরম দুর্ভোগে পড়েছে ওই জনপদের বিভিন্ন পেশার কর্মজীবী ও স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা। এলাকার কৃষকরা জানান, তারা কৃষির ওপরই নির্ভরশীল। বর্তমানে জমিনে প্রচুর সবজি রয়েছে। যোগাযোগ ব্যবস্থাটি বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ায় এসব সবজি জমিতেই নষ্ট হবে বলে দুঃশ্চিন্তায় আছেন কৃষকরা। ব্রিজটি দ্রুতই মেরামত করতে হবে। কারণ পুরো একটি জনপদ বিচ্ছিন্ন হয়েছে। এমনটাই জানালেন রাউজান উপজেলা নির্বাহী অফিসার শামীম হোসেন রেজা।
মিরসরাই থেকে মাঈন উদ্দীন জানান, প্রবল বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। পানিবন্দি হয়ে পড়েছে হাজারো পরিবার। জমির ফসল ও পুকুরের মাছ কিছুই নেই। অনেকে বাড়িঘর ছেড়ে উঁচু স্থানে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছে।
চন্দনাইশ থেকে মোজাহের কাদের জানান, পাহাড়ি ঢলের পানিতে চন্দনাইশের কিছু এলাকা প্লাবিত হয়েছে। নিচু এলাকায় ঘরবাড়ি ডুবে গেছে। থেমে থেমে বর্ষণের কারণে নিরাপদে সরে যেতে পেরেছে। তবে উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় রাস্তাঘাট নষ্ট হয়ে গেছে।
সাতকানিয়া উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান ইব্রাহীম চৌধুরী জানান, উপজেলার কিছু এলাকা পাহাড়ি ঢলে ডুবে গেছে। এতে চরম বিপদে পড়েছে নিম্ন আয়ের মানুষ। নিচু এলাকার ঘরবাড়ি ডুবে যাওয়ায় হাঁস-মুরগি নিয়ে অনেকে বিপদে পড়েছেন। তবে বৃষ্টি না হলে পানি কমে যাবে বলে তিনি জানান।
বৈরী আবহাওয়া ও টানা বৃষ্টির কারণে পাহাড়ি ঢলে বান্দরবানের সঙ্গে চট্টগ্রাম ও রাঙ্গামাটির সড়ক যোগাযোগ বন্ধ হয়ে গেছে। গতকাল মঙ্গলবার সকাল থেকে বান্দরবান-চট্টগ্রামের কেরানীহাট সড়কের আশপাশের খালবিল ভরাট হয়ে সড়ক প্রায় ৩-৫ ফুট পানির নিচে রয়েছে। এতে বান্দরবানের সঙ্গে চট্টগ্রামের সড়ক যোগাযোগ বন্ধ হয়ে পড়ে।
বান্দরবান সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী সজীব আহমেদ জানান, গত রাতে প্রবল বৃষ্টির কারণে বান্দরবানের প্রধান সড়কটি ডুবে গেছে।




সর্বশেষ সংবাদ

ব্যবস্থাপনা সম্পাদক: মো. হাফিজউদ্দিন
সম্পাদক - শরিফা নাজনীন
Mob : 01712 522087
ই- মেইল : [email protected]
Address : 125, New Kakrail Road, Shantinagar Plaza (5th Floor - B), Dhaka 1000
Tel : 88 02 8331019