• প্রচ্ছদ » ফিচার » একজন জনপ্রিয় পালা-নাট্যকার কেন্দুয়ার রাখাল বিশ্বাস


একজন জনপ্রিয় পালা-নাট্যকার কেন্দুয়ার রাখাল বিশ্বাস

জয়যাত্রা ডট কম : 02/01/2019

নেত্রকোণা থেকে সুলতান আহমেদ: পালা-নাট্যকার, সাংবাদিক, অভিনেতা, নাট্য-পরিচালক ও বহুরৈখিক লেখক রাখাল বিশ্বাস। এক নামে যিনি নাট্যব্যক্তি হিসেবে পরিচিত। তাঁর সঙ্গে খোলামেলা কথা হয় অনেক্ষন।

সাংস্কৃতিক জীবনের সাফল্য, ব্যর্থতা, দুঃখ-বেদনা, আনন্দ প্রাপ্তির সঙ্গে কন্ঠকাকীর্ণ পথকে মসৃণ করার লড়াই সংগ্রাম এবং অর্বাচীন-অযোগ্যের আস্কালন অসৎ নীতিহীনদের বিরোধীতা, ব্যর্থদের প্রগাগান্ডা ও সংকীর্ণমনাদের মুখে কালী ছিটিয়ে সাফল্য ও অগণিত মানুষের ভালবাসায় উজ্জীবিত হয়ে সমাজের কল্যাণে কাজ করা এই লেখক তাঁর ৪০ বছরের সাংস্কৃতিক জীবনে জমে থাকা অনেক কথাই বলেছেন। সেখান থেকে পাঠকদের জন্য কিছু অংশ তুলে ধরলাম। আমরা জানি সাংস্কৃতিক অঙ্গনে তার অনেক অবদান রয়েছে।

বিশেষ করে যাত্রানাট্যে। প্রাপ্তিও অনেক, অভিমানও কম নয়। এসব নিয়েই আলোচনা। তিনি এ প্রতিবেদককে জানান, ৫ম শ্রেণীতে পড়াকালীন পিজাহাতী গ্রামের প্রিয় আব্দুল আলী স্যারের পরিচালনায় বর্তমান কেন্দুয়া মডেল সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে পাঠ্য বই হতে নাটক, আনোয়ারের আম চুরি এবং ঈমান এই দু’টি নাটকে আনোয়ার এবং ইসহাক চরিত্রে অভিনয় করে ভূয়সী প্রশংসা এবং পুরষ্কার প্রাপ্তিই তাকে অভিনয় জগতে উদ্বুদ্ধ করে। ১৯৬১ ইং সনের ১৫ মার্চ সোমবার রাখাল বিশ্বাসের জন্ম। পিতা স্বর্গীয় গৌরাঙ্গ চন্দ্র বিশ্বাস, মাতাÑশেফালী রাণী বিশ্বাস, গ্রাম-কান্দিউড়া, বর্তমানে পৌরসদর, ৩ নং ওয়ার্ড, উপজেলা-কেন্দুয়া, জেলা-নেত্রকোণা।

৪ ভাই ২ বোনের মধ্যে তিনি দ্বিতীয়। স্ত্রী বীণা রানী বিশ্বাস, পুত্র-রবিন বিশ্বাস, রাতুল বিশ্বাস এবং সাতুল বিশ্বাস, পুত্রবধু বন্যা রাণী বিশ্বাস, পপি রাণী বিশ্বাস এবং নাতনী অবন্তিকা বিশ্বাস স্পৃহা অন্তু, এই ৩ পুত্র ,দুই পূত্রবধু , নাতনী এবং স্ত্রীকে নিয়ে তার সংসার। সংসার জীবনে পরিবারটি সুখী। লেখক জানান, ১৯৭৮ ইং সনে প্রখ্যাত যাত্রাভিনেতা মতিয়র রহমন চেয়ারম্যান পরিচালিত কানাইলাল নাথ রচিত ‘‘ মা ও ছেলে’’ নাটকে অনাথ আশ্রমের বালক জ্যোতি চরিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে প্রথম বড় মঞ্চে অভিনয় করেন।

সেই থেকে এখন পর্যন্ত তিনি দাপটের সাথে অভিনয় করে চলেছেন। ১৯৮৫ ইং সনে নাট্যগুরু ওস্তাদ সুশীল বিশ্বাসের (কেন্দুয়া সাজিউড়া গ্রামের প্রয়াত প্রখ্যাত যাত্রাশিল্পী) হাত ধরে কোহিনূর অপেরা নামক যাত্রাদলে আগমন করেন। পরে ১৯৯০ সন হতে পর্যায়ক্রমে মহুয়া অপেরা, তাজমহল অপেরা, পদ্মা অপেরা, যমুনা অপেরা, নেত্রকোণার বন্ধন নাট্যসংস্থা, অগ্রগামী যাত্রা ইউনিট, কৃষ্ণা অপেরা, জনি অপেরা, দি নবরঞ্জন অপেরা, রাজলক্ষ্মী অপেরাসহ ১০/১২ টি যাত্রাদলে কাজ করে ৩২ টি জেলার বিভিন্ন উপজেলার ৫ শতাধিক যাত্রামঞ্চে অভিনয়ের মাধ্যমে চারিত্রিক অভিনেতা বা অলরাউন্ডার শিল্পী হিসেবে বিশেষ মর্যাদা ও খ্যাতি অর্জন করেন।

তিনি ৪০ বছর অভিনয় জীবনে বিভিন্ন প্যান্ডেলে যাত্রাদল পরিচালনাসহ শতাধিক সফল মঞ্চ পরিচালনা করেন। তার হাত ধরে অনেক শিল্পী তৈরি হন। ১৯৯০ ইং সনের ‘‘দুঃখিনী বধূ’’ নামে প্রথম যাত্রাপালা রচনা করে ১৯৯১ ইং সনের ২২ ডিসেম্বর কেন্দুয়া নতুন বাসষ্ট্যান্ড এলাকায় নাটকটি যাত্রা প্রদর্শনী মঞ্চে মঞ্চস্থ হয় এবং ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে। পরে তিনি প্রতি বছরই পালা রচনা ও মঞ্চায়ন করে পালাকার হিসেবে নিজজেলাসহ প¦ার্শবর্তী জেলা উপজেলায় সুনাম অর্জন করেন।

** বই প্রকাশ-২০০১ সনের সেপ্টেম্বর ও নভেম্বর মাসে ঢাকা বাংলা বাজার মফিজ বুক হাউজ কর্তৃক ‘ঘর ভাঙ্গা সংসার’ এবং ‘প্রেয়সী পতিতা’ নামে দুটি বই ছাপা অক্ষরে প্রকাশিত হয়ে সারাদেশের লাইব্রেরীগুলোতে ব্যাপক চাহিদা তৈরি করে। তার পালা দুটি যাত্রাদলসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সুনামের সাথে পরিবেশিত হয়।

** পালা-নাটক সমূহ- দুঃখীনি বধূ, প্রেয়সী পতিতা/মানস প্রতিমা, রক্তাক্ত সমাজ, মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক নাটক একাত্তরের সৈনিক, স্বাধীনতার লাল সূর্য, দস্যূ রানার ফাঁসি, কালো বাদশা, ঘর ভাঙ্গা সংসার, বারবনিতার কান্না, ঝুমুর যাত্রা- ডাইনী বেগম, নীল দরিয়ার মাঝি, বনফুলের মালা, রামযজ্ঞ বা সীতাবনবাস, সখিনার যুদ্ধ, ইবলিসের পরিনতি, সূর্য-কিরণ’ ছাড়াও বিষয় ভিত্তিক বাল্য বিবাহ বিরোধী নাটক ‘‘কোনো এক চম্পার কথা’’ নারী অধিকারের নাটক ‘‘চোরের বউ’’, সচেতনতামূলক নাটক ‘‘কুদরত আলী এখন জেলে’’, ‘‘ঘূর্নিঝড়’’, রোমান্টিক নাটক ‘‘দুজন দুজনার’’, ইভটিজিং বিরোধী নাটক ‘‘কুলাঙ্গার’’, প্রতিবন্ধিদের নাটক ‘‘ওরাও মানুষ’’, ‘‘স্বপ্ন’’, মৈমনসিংহ গীতিাকর নাট্যরূপ ‘‘কংক-লীলা’’ ‘‘মহুয়া সুন্দরী’’, হাসির নাটক ‘‘রং বেরং’’, বাংলা নববর্ষের নাটক ‘বিচার’ শারদীয় নাটক ‘অসুরবধ’। এছাড়াও তিনি বহু কবিতা, গল্প, গান, কীর্তন, ছড়া, বাণী, প্রবন্ধ, ফিচার ও ‘আজও বাজে সেই কাকঁন’ নামে একটি উপন্যাস রচনা করেন।

** বাংলা একাডেমীর সহকারী পরিচালক ড. তপন বাগচী কর্তৃক লেখা যাত্রাগ্রন্থ ‘‘বাংলাদেশের যাত্রাগান, জনমাধ্যম ও সামাজিক পরিপ্রেক্ষিত’’ নামক মূল্যবান বইটির ৯৭ পৃষ্টায় পালাকার হিসাবে রাখাল বিশ্বাসকে নিয়ে প্রশংসা সূচক লেখাটি তাকে উৎসাহিত করেছে বলে তিনি জানান।

** সংগঠক- তিনি কেন্দুয়া সাহিত্য সংসদের যুগ্ম সম্পাদক, প্রগতি পাঠক চক্রের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক, রাজেশ্বরী নাট্যদল ও সৌখিন নাট্যগোষ্ঠীর প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, নারী নির্যাতন প্রতিরোধ কমিটির সাবেক সাধারণ সম্পাদক, প্রেসক্লাবের সাংস্কৃতিক সম্পাদক, পৌর আওয়ামীলীগের সাংস্কৃতি বিষয়ক সম্পাদক, বাংলাদেশে উদীচি শিল্পীগোষ্ঠী কেন্দুয়া শাখার প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের সাধারন সম্পাদক, হুমায়ূন আহমেদ স্মৃতি সংঘের আহ্বায়ক, মানবাধিকার নাট্য পরিষদের সাবেক সভাপতি, মানবাধিকার কমিশনের উপজেলা সদস্য, নেত্রকোণা জেলা শিল্পকলা একাডেমির আজীবন সদস্য, কেন্দুয়া শিল্পকলা একাডেমির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য, পাবলিক লাইব্রেরীর সদস্য। দীঘদিন ধরে তিনি লোকজ ধারার বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কাজ করতে গিয়ে বিভিন্ন অঞ্চলের গীত, ব্রতকথা, শিলুক, তমিছাল, রারমাসি পূজা পার্বন, কিচ্ছাপালাসহ গ্রামীণ ঐতিহ্যের বেশ কিছু হারানো উপাদান সংগ্রহ করে চলেছেন।

** সাংবাদিকতা- ১৯৯৫ ইং সনে নেত্রকোণার বাংলার দর্পন পত্রিকার মাধ্যমে সাংবাদিকতা শুরু করে ঢাকার দৈনিক প্রভাত পত্রিকার মাধ্যমে কেন্দুয়া উপজেলা প্রতিনিধি হিসাবে জাতীয় পত্রিকায় সাংবাদিকতা শুরু করেন। পরবর্তীতে দৈনিক সমাচার, দৈনিক জনতা, বাংলাবাজার পত্রিকা, আমাদের সময় এবং অনলাইন ঢাকা টাইমস্-২৪ ও তাজা খবর-২৪ এ সাংবাদিকতা করেন। বর্তমানে আমাদের সময়, দৈনিক জনতা ও উপরোক্ত দুটি অনলাইনের উপজেলা প্রতিনিধি ও দৈনিক জননেত্র পত্রিকায় সুনামের সঙ্গে সাংবাদিকতা করছেন। তাছাড়াও তিনি বিভিন্ন পত্রিকায় ফিচার,প্রবন্ধ, গল্প, কবিতাসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে নিয়মিত লিখে যাচ্ছেন।

**পুরষ্কার: ময়মনসিংহ বিভাগীয় উদীচীর ৩ দিনব্যাপী নাট্যৎসবে নেত্রকোণার নাট্যজন সম্মাননা, জেলা শিল্পকলা একাডেমী গুনীজন পদক, সাংস্কৃতিক মন্ত্রনালয় কর্তৃক সাংস্কৃতি উৎসবে নবাব সিরাজ-উদ-দৌলার একক অভিনয়ে সনদপত্র ও পুরষ্কার গ্রহন করেন।

এছাড়া গত ২৫ অক্টোবর/১৮ শিল্পকলা একাডেমী কর্তৃক ৬৪ জেলায় দেশীয় পালাকারদের পালা মঞ্চায়ন হয়। সেখানে রাখাল বিশ্বাসের ঘর ভাঙ্গা সংসার ফেনি জেলায় এবং প্রেয়সী পতিতা বা আমার মানস প্রতিমা মাগুরাতে জেলা শিল্পকলা একাডেমীর আয়োজনে সরকারীভাবে মঞ্চস্থ হয়। এ প্রতিবেদকের মাধ্যমে তিনি জানান, সাহিত্য, সংস্কৃতি, অভিনয়শিল্প, সাংবাদিকতা তথা মানুষের কল্যাণে কাজ করে কর্মগুনে মরেও বেঁচে থাকতে চাই।




সর্বশেষ সংবাদ

ব্যবস্থাপনা সম্পাদক: মো. হাফিজউদ্দিন
সম্পাদক - তোফাজ্জল হোসেন
Mob : 01712 522087
ই- মেইল : [email protected]
Address : 125, New Kakrail Road, Shantinagar Plaza (5th Floor - B), Dhaka 1000
Tel : 88 02 8331019