• প্রচ্ছদ » মতামত » পাক-ভারত উত্তেজনা কি ভারতের নির্বাচনকে প্রভাবিত করবে?


পাক-ভারত উত্তেজনা কি ভারতের নির্বাচনকে প্রভাবিত করবে?

জয়যাত্রা ডট কম : 02/03/2019

আহমেদ শরীফ : ২৮শে ফেব্রুয়ারি পাকিস্তান সরকার ভারতীয় বিমান বাহিনীর পাইলট উইং কমান্ডার অভিনন্দন ভার্থামানকে মুক্তি দেয়ায় দুই দেশের যুদ্ধাবস্থা স্বাভাবিক হয়ে আসার আভাস পাওয়া যাচ্ছে। ২৮শে ফেব্রুয়ারি অভিনন্দনকে মুক্তি দেওয়ার ঘোষণা দেয়ার পর ১ মার্চ নিজ মাতৃভূমিতে ফেরেন ভারতের এই বিমান সেনা। অভিনন্দনকে মুক্তির বিষয়ে পাকিস্তানের ঘোষণা দেয়ার আগেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উন-এর সাথে বৈঠকের পর সাংবাদিকদের বলেছিলেন,

ভারত-পাকিস্তান থেকে মোটামুটি ভালো সংবাদই পাওয়া যাচ্ছে। তিনি আশা করেন যে, খুব সম্ভবতঃ দুই দেশের চলমান সংঘাতের অবসান ঘটতে যাচ্ছে। এর মাঝে গত ক’দিন ধরেই ভারত-পাকিস্তান লাইন অব কন্ট্রোল (এলওসি) অতিক্রম করে উভয় দেশের বিমান হামলার অভিযোগ এবং পাল্টা অভিযোগের মাঝে আসলে কি ঘটেছিল সেটা যেমন বোঝা কঠিন হয়ে যাচ্ছিল; তেমনি মিডিয়ার জন্যেও দুই পক্ষের সরকারি বার্তার উপরে নির্ভর করা ছাড়া গতি ছিল না।

উভয় দেশই দাবি করেছে যে, অপর দেশের বিমান অন্তর্জাতিক সীমানা লংঘন করেছে। তবে উভয়েই অপরের মিশনকে ব্যর্থ প্রমাণের চেষ্টা করেছে। বড় পরিসরে ঘটনাগুলির বিশ্লেষণের জন্যে সংঘাতের ঘটনাপ্রবাহ ছাড়াও ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির দিকেও তাকাতে হবে।

১৪ই ফেব্রুয়ারি ঘটনার শুরু। ভারত-অধিকৃত কাশ্মীরের পুলওয়ামা জেলায় ভারতীয় নিরাপত্তা বাহিনীর গাড়িবহরে আত্মঘাতী বোমা হামলায় কমপক্ষে ৪০ জন ভারতীয় সেনা নিহত হয়। কাশ্মীরের জাইশ-ই-মোহাম্মদ (জেইএম) এই হামলার দায় স্বীকার করলেও ভারত বলে আসছে যে, পাকিস্তান জেইএম-কে সমর্থন দিচ্ছে। এই হামলা ভারতীয় জাতীয়তার গোড়ায় আঘাত করে; যার ফলে হামলার একটা ‘সমুচিত জবাব’ দিতে গিয়ে নরেন্দ্র মোদি সরকারের সামনে সামরিক মিশন ছাড়া আর কোনো পথ খোলা ছিল না। ২৫শে ফেব্রুয়ারি ভারত দাবি করে যে, সেদিন ভোর বেলায় ভারতীয় বিমান বাহিনীর ফরাসী-নির্মিত ‘মিরাজ-২০০০’ যুদ্ধবিমান এলওসি থেকে ৮০ কিঃমিঃ দূরে পাকিস্তানের অভ্যন্তরে এবোটাবাদের কাছাকাছি বালাকোট নামক স্থানে জেইএম-এর সবচাইতে বড় ট্রেনিং ক্যাম্পে বোমা হামলা করেছে। ভারতের পররাষ্ট্র সচিব বিজয় গোখালে ভারতীয় হামলায় নিহতের সংখ্যা না বললেও পরবর্তীতে আরেকজন ভারতীয় কর্মকর্তা দাবি করেন যে, হামলায় ৩’শ-এর মতো জইশ সদস্য নিহত হয়েছে; অপরদিকে ভারতীয় বিমান বাহিনীর কোন ক্ষয়ক্ষতি হয়নি।

ভারতীয় বিশ্লেষকদের কথায় এই মিশনটা ছিল বেশ বড় ধরনের একটা সাফল্য। নিহতের সংখ্যার ব্যাপারে পরবর্তীতে ভারতীয় বিমান বাহিনী তেমন একটা তোড়জোড় না করলেও পাকিস্তান ব্যাপারটাকে পুরোপুরি মিথ্যা বলে দাবি করে। বালাকোট থেকে ‘রয়টার্স’এর এক প্রতিবেদনে বলা হয় যে, সেখানে তেমন কোনো ক্ষয়ক্ষতি দৃশ্যমান নয়। তবে পাকিস্তান স্বীকার করে যে, ভারতীয় ফাইটার জেটগুলি পাকিস্তানের সীমানা অতিক্রম করেছে এবং বোমাও ফেলেছে। ভারতীয় মিশনের পর পুরো ভারত জুড়ে জনগণ সামরিক বাহিনীর পিছনে দাঁড়ায়। ক্রিকেটার এবং বলিউড তারকারাসহ বহু জনপ্রিয় ব্যক্তিরা বিমান হামলার ভূয়সী প্রশংসা করেন।

ঘটনা নাটকীয় মোড় নেয়, যখন ২৬শে ফেব্রুয়ারি পাকিস্তান দাবি করে যে তারা ভারতীয় বিমান বাহিনীর দু’টা ‘মিগ-২১’ ফাইটার বিমান ভূপাতিত করেছে, এবং একজন পাইলটকে বন্দী করেছে। এর কয়েক ঘন্টার মাঝেই পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান ভারতকে শান্তির প্রস্তাব দেন। ভারতীয় কর্মকর্তারা পরবর্তীতে স্বীকার করে নেয় যে তাদের একজন পাইলট পাকিস্তানে আটক হয়েছে; তবে তারা এ-ও দাবি করেন যে, সেই পাইলট ভূপাতিত হবার আগেই পাকিস্তান বিমান বাহিনীর একটা মার্কিন-নির্মিত ‘এফ-১৬’ যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করে, যা কিনা পাকিস্তান-নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। প্রমাণ হিসেবে ভারতীয়রা ‘এফ-১৬’ যুদ্ধবিমানের ব্যবহার করা ক্ষেপণাস্ত্রের ধ্বংসাবশেষের ছবি দেখায়। পাকিস্তান ভারতের এই দাবি অস্বীকার করে। আর ভারতীয় বিমান ভূপাতিত করার ঘটনায় পাকিস্তানে উৎসব লেগে যায়। মার্কিন-নির্মিত ‘এফ-১৬’ যুদ্ধবিমানকে আলোচনায় এনে ভারত চাইছে পাকিস্তানের উপরে মার্কিন চাপ বৃদ্ধি করতে। অন্যদিকে বিমান ভূপাতিত এবং পাইলট গ্রেপ্তার হবার ঘটনা ভারতকে ‘সহজ বিজয়’ লাভ থেকে বঞ্চিত করে।

এই ঘটনার পরবর্তী নাটক শুরু হয় ২৮শে ফেব্রুয়ারি, যখন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান পার্লামেন্টে গ্রেপ্তারকৃত ভারতীয় পাইলটকে মুক্তি দেবার কথা ঘোষণা করেন। পরদিন পহেলা মার্চ সেই পাইলটকে পাক-ভারত সীমানার আত্তারি নামক স্থানে ভারতীয় সরকারি কর্মকর্তাদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। ভারতের ‘এনডিটিভি’এর এক প্রতিবেদনে বলা হয় যে, ভারতীয়রা অধীর আগ্রহে সেই উইং কমান্ডারের জন্যে অপেক্ষা করছিল, এবং তাকে এখন ভারতের ‘সত্যিকারের হিরো’ বলা হচ্ছে। তবে এরকম হিরো বনে যাবার পেছনে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর পক্ষ থেকে ভারতীয় পাইলটের ভিডিও প্রকাশ করাটা অনেক গুরুত্বপূর্ণ ছিল। ভিডিওর কারণে ভারতীয় জনগণের সাথে দু’দিন আগেও অচেনা এই পাইলটের যোগসূত্র তৈরি হয়।

ভারতীয় জনগণের মুখে এখন ভারতীয় বিমান বাহিনীর পাইলটের বীরত্বের কাহিনী, যা কিনা অল্প কিছুদিন আগের পুলওয়ামার শোককে প্রতিস্থাপিত করেছে। ক্ষমতাসীন দল বিজেপির বিরোধীরাও সামরিক বাহিনীর প্রশংসা করছেন; কিছুদিন আগেও যেখানে তাদের মূল বক্তব্য ছিল নরেন্দ্র মোদি সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করার দাবি। দু’মাসের মাঝে ভারতে লোকসভার নির্বাচন।

‘রয়টার্স’এর এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, পাকিস্তানের অভ্যন্তরে বিমান হামলা ইতোমধ্যেই মোদির পূনঃনির্বাচিত হবার সম্ভাবনাকে বাড়িয়ে দিয়েছে। ‘ফোর্বস’ ম্যাগাজিনের এক লেখাতেও একই কথা বলা হচ্ছে।
অন্যদিকে ভারতের ‘ইকনোমিক টাইমস’এর এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, ভারতের বিরোধী দলগুলি পাকিস্তান ইস্যুতে সরকারকে সমর্থন করলেও সরকার যেন নির্বাচন জয়ে এই ইস্যুকে ব্যবহার করতে না পারে, সেদিকে তারা খেয়াল রাখছে। মোট কথা নির্বাচনের মাত্র দু’মাস আগে জনগণের কাছে জাতীয় নিরাপত্তাই হয়ে গিয়েছে মূল আলোচ্য বিষয়, যার ফল ক্ষমতাসীন বিজেপির ভোগ করার সম্ভাবনাই বেশি দেখা যাচ্ছে। ১৪ই ফেব্রুয়ারির পুলওয়ামার বোমা হামলা যেমন ভারতীয় জনগণের জাতীয়তাবোধ জাগিয়ে তোলার জন্যে গুরুত্ব ছিল, ঠিক তেমনি ২৫শে ফেব্রুয়ারির বিমান হামলা গুরুত্বপূর্ণ ছিল পুলওয়ামার ক্ষত সারিয়ে নেবার জন্যে। আর পহেলা মার্চে বিমান বাহিনীর পাইলটের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন ছিল যুদ্ধ ভুলে ভারতীয় জাতীয়তাবোধ নিয়ে গর্ব করায় ব্যস্ত হবার জন্যে গুরুত্বপূর্ণ। এই সবগুলি ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে পাকিস্তান। পাকিস্তানের জন্যে দিল্লীর ক্ষমতায় বিজেপি বা কংগ্রেসের সরকার কতটা গুরুত্বপূর্ণ, তার মাঝেই হয়তো নিহিত রয়েছে এই সংঘাতে পাকিস্তানের সাফল্য-ব্যর্থতা।

লেখক: ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষক




সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদক - তোফাজ্জল হোসেন
Mob : 01712 522087
ই- মেইল : [email protected]
Address : 125, New Kakrail Road, Shantinagar Plaza (5th Floor - B), Dhaka 1000
Tel : 88 02 8331019