• প্রচ্ছদ » ফিচার » নীলফামারীর সৈয়দপুরে হরিজন নেত্রী তুতিয়া বাসফোর জীবন যুদ্ধে বিজয়ী এক সফল নারী


নীলফামারীর সৈয়দপুরে হরিজন নেত্রী তুতিয়া বাসফোর জীবন যুদ্ধে বিজয়ী এক সফল নারী

জয়যাত্রা ডট কম : 13/03/2019

হরিজন নেত্রী তুতিয়া বাসফোর।

ওবায়দুল ইসলাম সৈয়দপুর (নীলফামারী) প্রতিনিধি ঃ শ্রীমতি তুতিয়া বাসফোর। বয়স চলছে প্রায় ৬৫ বছর। থাকেন সৈয়দপুর শহরের মুন্সিপাড়া দরমাপট্টি সুইপার কলোনীতে। বাবা বেনারসি বাসফোর। তুমিয়া বাসফোরকে তার বাবা বিয়ে দেন ঢাকায়।

বিয়ের পর স্বামীকে নিয়ে অনেক আনন্দ উল্লাসে চলতো তার সংসার জীবন। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস তুতিয়ার জীবনে নেমে আসে ঘোর অন্ধকার। বিয়ের প্রথম বছরে যখন তুতিয়ার গর্ভে সন্তান আসে ঠিক তখনই সন্তান প্রসবের পূর্বেই মারা যান তার স্বামী গণেশ বাসফোর। গর্ভে ৬ মাসের সন্তান নিয়ে তুতিয়া স্বামীর বাড়ি ছেড়ে ঢাকা থেকে চলে আসেন বাবার বাড়ি সৈয়দপুরে।

এরপর তার কন্যা সন্তান জন্ম নেয়। তার নাম রাখেন ভারতী রানী। তুতিয়া তার কন্যা সন্তানকে নিয়ে স্বপ্ন দেখেন, স্বপ্ন আঁকেন। সুখের স্বপ্নে তুতিয়া বাসফোর যখন বিভোর। ঠিক তখনই তার বাবা মারা যান। তারপরও তুতিয়া থেকে থাকেননি। মেয়েকে লেখাপড়া শিখে বড় করবে আর সে আশায় টগবগে যৌবনেও সে আর দ্বিতীয় বিয়ে করেননি। সন্তানকে কোলে আগলে রেখে পুরো জীবনটা শেষ করে দিলেন সে। এরই মধ্যে মেয়ে বড় হয়ে উঠে। অভাবের তারনায় তাকে তেমন একটা লেখাপড়া শেখাতে পারেননি। নি¤œ মাধ্যমিক লেখাপড়া করার পর হঠাৎ বিয়ে হয়ে যায় মেয়ের।

স্বামী থাকেন রংপুর শহরের সদর হাসপাতাল ক্যাম্পাসে। তুতিয়া দ্বিতীয় বিয়ে না করে বাকি জীবনটা স্বপ্ন দেখেন কিভাবে নিচু জাত হরিজনদের ভাগ্যের উন্নয়ন ঘটানো যায়। সমাজে আর ১০ জন লোকের মতো হরিজনরাও পথ চলতে পারে। সম্মান পায় সমাজের কাছে। এ চিন্তা মাথায় তার সারাক্ষণ নারা দেয়। আর এভাবেই তুতিয়া বাসফোর পথ চলতে থাকে। যত বাধা বিড়ম্বনা পিছনে ফেলে সে এগুতে থাকে সামনের দিকে। হরিজনদের নানাবিধ সমস্যার কথা নিয়ে তুতিয়া এগিয়ে যায় সামনে।

২০১৩ সালের ২৮ অক্টোবর বাংলাদেশ বাসফোর হরিজন কল্যান পরিষদ রংপুর বিভাগীয় কমিটির নারী ও শিশু বিষয়ক সম্পাদক নির্বাচিত হন। বাংলাদেশ হরিজন ঐক্য পরিষদ নীলফামারী জেলা শাখা গঠিত হয় ১৯৯৮ সালে। ২০১৭ সালের ৬ জানুয়ারি নির্বাচনের মধ্য দিয়ে তুতিয়া বাসফোর জেলা কমিটির সহ-সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। বর্তমানে তিনি বাংলাদেশ বাসফোর হরিজন কল্যান পরিষদ ঢাকা কেন্দ্রীয় কমিটির মহিলা বিষয়ক সম্পাদক।

গত ২০১০ সালের ১১ এপ্রিল থেকে ২৪ এপ্রিল পর্যন্ত তিনি বেলজিয়াম, বাহরাইন, দার্জিলিং, ব্রাসেল্স সফল করেন। সেখানে জার্মানিতে ১৯টি সেমিনারে অংশ নেন এবং সৈয়দপুরের অবহেলিত হরিজনদের বিভিন্ন সমস্যা এবং এর সমাধানের কথা তুলে ধরেন। তার বক্তব্য শুনে সেমিনারে অংশগ্রহণকারীগন কেঁদে ফেলেন। সেখানে বাংলাদেশ দুতাবাসের প্রতিনিধি তাকে নিজ বাসায় রাতের খাবারের আমন্ত্রন জানান। এসবের নেপথ্যে ছিলেন বিভিন্ন এনজিও ও জিও সংগঠন। বর্তমানে তিনি হরিজন সম্প্রদায়ের সন্তানদের শিক্ষিত করে গড়ে তুলতে কলোনিতে প্রতিষ্ঠা করেন একটি বিদ্যালয়। ইতিমধ্যে হরিজনদের সন্তানেরা স্কুল-কলেজে ভর্তির সুযোগ পেয়েছে।

তবে সেলুনে চুল, দাড়ি, গোফ কাটতে দেয়া হয় না তাদের। খাবার হোটেলে দেয়া হয় না প্রবেশের। সরকারি ভাবে চাকুরির কোঠা বরাদ্দ থাকলেও অর্থের অভাবে ওই কোঠা চলে যায় ভিন্ন ধর্মের কাছে। তাছাড়া আদিকাল থেকে সমাজে হরিজনদের দেখা হয় ছোট জাত হিসেবে। তুতিয়া বাসফোর জানান, বর্তমানে এ সভ্য যুগে আগের অনেক কিছু বিলিন হয়ে গেছে। আমরা সবাই মানুষ, রক্তে মাংসে গড়া। কিন্তু কেন আমাদেরকে সমাজে অনেক কিছু থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে। আমরা শিখতে চাই, জানতে চাই, চাই আরো দশজন মানুষের মতো সমাজে বেঁচে থাকতে।

তাইতো জীবন সংগ্রামের শেষ প্রান্তে এসে তিনি দেখা করতে চান মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সাথে। কিন্তু কে শোনে কার কথা, তিনি কি পারবেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সাথে দেখা করতে। কে দেবে এ সুযোগ করে। তিনি আরও জানান বর্তমানে সৈয়দপুর শহরে হরিজন সম্প্রদায় রয়েছে মুন্সিপাড়া দর্মাপট্টি হরিজন কলোনীতে ২৬ পরিবার, রসুলপুর কলোনীতে ২৬ পরিবার, হাতিখানায় ১০ পরিবার, নতুন বাবুপাড়ায় ১৬ পরিবার, সুরকি মহল্লায় ৬ পরিবার, বাঙালিপুর নিজপাড়ায় ২ পরিবার, পুলিশ লাইন কলোনীতে ৩ পরিবার ও ঢেলাপীর আবাসনে ১ পরিবার। শহরের ৮ স্থানে বসবাসরত পরিবারগুলোতে প্রায় ১ হাজার নারী পুরুষ সদস্য রয়েছে।

পরিবার, সমাজ ও দেশের উন্নয়নের সাথে সাথে হরিজন সম্প্রদায়েরও আজ অনেকটা উন্নয়ন হয়েছে। সেই আদিকাল থেকেই হরিজনকে সমাজের সবচেয়ে নিচু জাত বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। কিন্তু আজ আমরা যুগের সাথে তাল মিলিয়ে এবং বিভিন্ন এনজিও, জিও’র সহযোগিতায় অনেকে নিজেদেরকে পরিবর্তন করেছি। এক সময় আমাদের সন্তানদের কোন প্রতিষ্ঠানে ভর্তি করাতে পারতাম না। পায়ে জুতা পরে আমরা বাইরে বেড়াতে পারতাম না। নাপিতরা ছোট জাত বলে আমাদের চুল, দাড়ি কাটতেন না। খাবার হোটেলে গিয়ে বাইরে বসে থাকতাম। সঙ্গে নিয়ে যেতাম একটি গ্লাস। ওই গ্লাসে চা-পানি নিয়ে বাইরে বসে খেয়ে চলে আসতাম।

সমাজের কোন ভালো কাজে বা কোন ধরনের অনুষ্ঠানে আমরা যেতে পারতাম না। বা ডাকা হতো না। তবে যেখানে যেতাম পরিস্কার পরিচ্ছন্নতার কাজে। আজ ওইসকল সমস্যাগুলোর অনেকটা সমাধান হয়েছে। যেমন লেখাপড়া করতে চাইলে আমাদের সন্তানদের স্কুল ও কলেজে ভর্তি করা হচ্ছে। চুল দাড়িও কেউ কেউ নাপিতের কাছে কাটছেন। তবে হোটেলে খেতে দেয়া হচ্ছে না। এমনি আরও কিছু সমস্যা রয়েছে হরিজন সম্প্রদায়ের। আর ওই সকল সমস্যার কথা নিজ মুখে প্রধানমন্ত্রীর সাথে সাক্ষাতে চলতে চান তিনি। সে আশায় হরিজন সম্প্রদায়ের এ নেত্রী পথ চেয়ে বসে আছেন।

 




সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদক - তোফাজ্জল হোসেন
Mob : 01712 522087
ই- মেইল : [email protected]
Address : 125, New Kakrail Road, Shantinagar Plaza (5th Floor - B), Dhaka 1000
Tel : 88 02 8331019