• প্রচ্ছদ » অর্থনীতি » চালের বাজার অস্থিতিশীল করতে মাঠে নামছে অসাধু ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেট


চালের বাজার অস্থিতিশীল করতে মাঠে নামছে অসাধু ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেট

জয়যাত্রা ডট কম : 11/06/2019


জয়যাত্রা ডটকম ডেস্ক :
আবার চালের বাজার অস্থিতিশীল করতে মাঠে নামছে মুনাফাখোর সিন্ডিকেট এবং খাদ্যে ভেজালকারী ও অসাধু ব্যবসায়ীরা । তাদের কারসাজিতে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে নাগরিক জীবন আজ অতিষ্ঠ।
আর চালের বাজারে সিন্ডিকেটর হিংস্র থাবা নিয়ে গবেষণামূলক প্রতিবেদনটি তৈরি করেছেন কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) ভাইস প্রেসিডেন্ট এসএম নাজের হোসাইন।

তার প্রকাশিত প্রতিবেদনটি প্রঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো; এক শ্রেণীর নীতি-আদর্শহীন, অতি মুনাফালোভী, অসাধু ব্যবসায়ীদের দিনে দিনে কোটিপতি হওয়ার বাসনায় তাদের ইচ্ছামতো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যদ্রব্যের মূল্য সংকট সৃষ্টি করে ও দাম বাড়িয়ে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা অচল করে দিয়েছে; যার ফলে সাধারণ মানুষের জীবন-জীবিকা নির্বাহ করা কঠিন ও অসম্ভব হয়ে পড়েছে। ব্যবসায়ীরা আন্তর্জাতিক বাজারের দোহাই দিয়ে দাম বাড়ালেও ওই পণ্যের আন্তর্জাতিক মূল্য কমলেও তারা আর কমায় না।

সরকার গুটিকয়েক অসৎ ব্যবসায়ীর স্বার্থসংরক্ষণে সব রীতিনীতি প্রণয়ন করার কারণে সাধারণ জনগণের স্বার্থ বারবার উপেক্ষিত হয়। ফলে ব্যবসায়ীরা পণ্যের দাম ইচ্ছামতো বাড়ায়, কমায় এবং সরবরাহসহ বাজার নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে জনগণকে জিম্মি করে কোটি কোটি টাকা পকেটস্থ করেন।

দেখা যাচ্ছে, সিএনজি অটোরিকশা ও বাস ভাড়া থেকে শুরু করে নগরীর সেলুন, ফটোস্ট্যাট, ফার্মেসি, রিকশাওয়ালাসহ সবাই তাদের ইচ্ছামতো মূল্য নির্ধারণ করছে। সেখানে সরকারি কোনো সমন্বয় তো দূরের কথা, সরকারের সংশ্লিষ্ট লোকজন এর খবরই রাখছে না। উপরন্তু তাদের এ কর্মকাণ্ডকে বৈধতা দেয়া, সরকারের ভর্তুকি লাভের আশায় ও কর ফাঁকির কুমতলবে এসব ব্যবসায়ী রমজান কিংবা অন্যান্য উৎসব-পার্বণে সুদৃশ্য মোড়কে ন্যায্যমূল্যের দোকান খুলে সাধারণ জনগণের সঙ্গে ছলনা করছে।

বলার অপেক্ষা রাখে না, পাইকারি ও খুচরা বাজারের মাঝে সমন্বয় করা হলে, মজুদদারি ও একচেটিয়া আমদানির দৌরাত্ম্য কমাতে পারলে দ্রব্যমূল্য অনেকাংশে কমত। নিত্যপ্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্যের মূল্য নিয়ন্ত্রণে যখনই আলোচনা হয়, পাইকারি ব্যবসায়ীরা খুচরা ব্যবসায়ীদের দোষারোপ করে আর খুচরা বিক্রেতারা পাইকারি ব্যবসায়ীদের দোষারোপ করে।

বিভিন্ন উৎসব সামনে রেখে একশ্রেণীর মজুদদারি, সিন্ডিকেট চক্র প্রশাসন ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার লোকজনের নাকের ডগায় বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করে চিনি, সয়াবিন, পেঁয়াজ, ছোলা সংকট করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। এ চক্রটি আবার নতুন করে চাল সংকটের পাঁয়তারা করছে। এসব মজুদদারি, অসাধু ব্যবসায়ী ও সিন্ডিকেটকারীদের সঙ্গে প্রশাসন এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কিছু লোকের আঁতাতের কারণে তারা জনগণের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে।

এদের অনেকেই আবার সাধু সাজার জন্য পবিত্র ওমরা পালন করে হাজী এবং বিভিন্ন সভা-সেমিনারে মোটা অঙ্কের দান-খয়রাত করে সাদা মনের মানুষসহ নানা গুণীজনের বেশ ধারণ করেন। অনেকে আবার সমাজসেবক হয়ে সমাজ দরদি হয়ে ওঠেন। তাদের এ অপতৎপরতার কারণে পুরো সমাজ কলুষিত হচ্ছে। আমরা দেখি- চিনি, সয়াবিন ও চাল কেলেঙ্কারির নায়কদের নিয়ে প্রশাসন মনিটরিং কমিটি গঠন করছে; তারা সেখানে সরকারি নীতিনির্ধারণী মহলকে বিভ্রান্তিকর তথ্য দিয়ে ভুল পথে পরিচালিত করে থাকে।

মহামান্য হাইকোর্ট এক রিট আবেদনে গত মাসে বলেছেন, খাদ্যে ভেজালের কারণে দেশ বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়েছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ড অ্যান্ড টেস্টিং ইন্সটিটিউশনের মান পরীক্ষায় নিম্নমান প্রমাণিত হওয়ায় ৫২টি প্রতিষ্ঠানের খাদ্য বাজার থেকে প্রত্যাহারের নির্দেশ দেন। হাইকোর্ট আরও পর্যবেক্ষণ দেন- খাদ্যে ভেজাল ও নিম্নমানের পণ্য এবং খাবারের কারণে এ দেশ বসবাসের জন্য অনিরাপদ হয়ে উঠেছে।

আদালত খাদ্যে ভেজালের বিরুদ্ধে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে যুদ্ধ ঘোষণার আহ্বান জানিয়েছেন। ভেজালকারীরা একদিকে যেমন পণ্যদ্রব্যের মূল্য বেশি নিয়ে সাধারণ মানুষের পকেট কাটছে, অন্যদিকে দুধ ও মাছে ফরমালিন, ইউরিয়া, ফলমূলে কার্বাইডসহ বিভিন্ন কেমিক্যাল মিশিয়ে কৃত্রিমভাবে পাকিয়ে এবং এগুলো তাজা রাখার জন্য সালফার নামে অন্য একটি কেমিক্যাল দিচ্ছে। শাকসবজি তাজা রাখার জন্য ব্যবহার করছে হরেক রকমের কেমিক্যাল।

নষ্ট ছোলা, ভালো ছোলার সঙ্গে এবং পচা চাল ভালো চালের সঙ্গে মিশিয়ে বিক্রি করছে। বিভিন্ন গুঁড়া মসলায় ইটের গুঁড়াসহ বিভিন্ন ক্ষতিকর দ্রব্য মিশ্রণ করে বিক্রি করছে; সরিষার তেলে মেশাচ্ছে সাইট্রিক এসিড। একই সঙ্গে শিঙারা তৈরিতে সয়াবিনের সঙ্গে পোড়া মবিল ব্যবহারের খবর আমরা সবাই জানি। হোটেল, রেস্তোরাঁ ও সুপারশপে অপরিষ্কার, অপরিচ্ছন্ন জায়গায় খাবার ও খাদ্যপণ্য বিক্রি করা হচ্ছে।

ভয়ংকর তথ্য হল, বিভিন্ন দেশ থেকে নিম্নমানের গুঁড়াদুধ এনে অস্ট্রেলিয়া থেকে আমদানি বলে মিথ্যা তথ্য দিয়ে প্রতারণা করে বাজারজাত করা হচ্ছে। যদিও দুগ্ধ উৎপাদনে দেশের অনেক অগ্রগতি হয়েছে। তারপরও বিদেশ থেকে গুঁড়াদুধ আমদানি করতে একটি মহল সবসময় সক্রিয়।

সম্প্রতি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের জনস্বাস্থ্য ইন্সটিটিউশনের অধীন ন্যাশনাল ফুড সেফটি ল্যাবরেটরির (এনএফএসএল) ও জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) সহায়তায় প্রতিষ্ঠিত জাতীয় নিরাপদ খাদ্য গবেষণাগারের উদ্যোগে গরুর দুধ, গরুর খাবার, দুগ্ধজাত দই ও প্যাকেটজাত দুধের ওপর জরিপ চালানো হয়।

আর বাজারে প্রচলিত সব ব্র্যান্ডের স্থানীয় ও আমদানিকৃত প্যাকেটজাত দুধের নমুনা সংগ্রহ করা হয় বিভিন্ন সুপার স্টোর থেকে; যা সংগ্রহ থেকে শুরু করে গবেষণাগারে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ নিয়ম মানা হয়েছে। গবেষণায় বলা হয়েছে, বাজারে প্রচলিত সব ব্র্যান্ডের স্থানীয় ও আমদানিকৃত প্যাকেটজাত দুধের নমুনা সংগ্রহ করে বিভিন্ন অণুজীব বিশেষ করে সিসা ও অ্যান্টিবায়োটিকের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে।

আবার অনেকে বিদেশ থেকে নিম্নমানের ও মেয়াদোত্তীর্ণ গুঁড়াদুধ আমদানি ও বাজারজাত করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়ে সম্পদের পাহাড় গড়ছে, দেশকে পরিণত করেছে ভেজালের স্বর্গরাজ্যে। এসব ভেজাল কেমিক্যাল মেশানো ফলমূল, শাকসবজি, তৈল, নিম্নমান ও মেয়াদোত্তীর্ণ গুঁড়াদুধ এবং শিশু খাদ্য, খাদ্যসামগ্রী খেয়ে মানুষ ক্যান্সার, কিডনি, লিভারের জটিল রোগ, মেধাহীন, বিকলাঙ্গ, বুদ্ধি প্রতিবন্ধী হয়ে জন্মগ্রহণ করছে। এমনকি মহিলারা বন্ধ্যত্ব রোগেও আক্রান্ত হচ্ছে।

খাদ্য দস্যুদের ভিত এতটাই শক্ত, সরকারি প্রশাসন যন্ত্র মনে হয় তাদের কাছে অসহায়। এরা টাকার জোরে সরকারি আমলা, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ও বিভিন্ন সংস্থাকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করে। কোনো কারণে ধরা পড়লেও আইনের ফাঁক-ফোকর গলে ঠিকই বেরিয়ে আসে।

এরকম জলজ্যান্ত মানুষ মেরে কোটিপতি হওয়া লোকের সংখ্যা দেশে দিনে দিনে বাড়ছে। ইতঃপূর্বে চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জে একই কায়দায় গুঁড়াদুধে ময়দা মিশ্রিত করার হোতাসহ চিনি, সয়াবিন ও চাল কেলেঙ্কারির হোতাদের কোনো শাস্তি হয়নি।

আর সাধারণ ভোক্তা হিসেবে জনগণ অসচেতন ও অসংগঠিত হওয়ায় তাদের ভেজাল, নিম্নমানের গুঁড়াদুধ, জাঙ্কফুড, শিশুখাদ্য ইত্যাদি নীরবে হজম করতে হচ্ছে।

বস্তুত বাংলাদেশকে ভেজাল ও নিম্নমানের খাদ্যের বাজার ও পরীক্ষাগারে পরিণত করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে একটি শ্রেণী। নিম্ন-মধ্যবিত্তরা যা আয়-রোজগার করছে, তার সিংহভাগই ওষুধ ও চিকিৎসার খরচ জোগাতে চলে যাচ্ছে।

তাই আসুন, অবিলম্বে মুনাফাখোর, মজুদদারি, সিন্ডিকেট, খাদ্যে ভেজালকারী ও তাদের সহযোগী সরকারি প্রতিষ্ঠানের পৃষ্ঠপোষকদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে ঐক্যবদ্ধ হই। মিথ্যা ঘোষণা, তথ্য বিকৃতির মাধ্যমে নিম্নমানের পণ্য আমদানিকারক; প্রতারক, ভেজাল মিশ্রণকারী, মজুদদারি, সিন্ডিকেট ও অসাধু ব্যবসায়ীদের বাজারজাতকৃত পণ্য বয়কট করে তাদের বিরুদ্ধে ঘৃণা জানাই। # একে




সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদক - তোফাজ্জল হোসেন
Mob : 01712 522087
ই- মেইল : [email protected]
Address : 125, New Kakrail Road, Shantinagar Plaza (5th Floor - B), Dhaka 1000
Tel : 88 02 8331019