নারী ও শিশুর ওপর সহিংসতা চলছেই

জয়যাত্রা ডট কম : 04/03/2020

আশরাফুল ইসলাম : দেশে নারীর ওপর সহিংসতা থেমে নেই। নির্যাতন প্রতিরোধে সরকারি-বেসরকারি নানা উদ্যোগের মধ্যেই সহিংসতার ঘটনা ঘটছে। ঘরে-বাইরে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান-কর্মস্থলে, রাস্তাঘাটসহ সর্বত্রই নারীর ওপর ঘটছে সহিংসতা। শিশু থেকে বৃদ্ধ- নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন সব বয়সের নারী। এমনকি পাশবিকতার হাত থেকে রেহাই পাচ্ছে না ছেলে শিশুরাও। সংশ্নিষ্টরা বলছেন, বাংলাদেশে ধর্ষণ ও ধর্ষণের পর হত্যার বিভীষিকা চলছে। যৌন নিপীড়ন থেকেই সূত্রপাত হয় এসব সহিংসতার। রাষ্ট্র ও সমাজের কার্যকরী পদক্ষেপের অভাবেই এসব ঘটনার লাগাম টেনে ধরা যাচ্ছে না।

এমন পরিস্থিতিতে আজ বুধবার পালিত হচ্ছে বিশ্ব যৌন নিপীড়নবিরোধী দিবস। যদিও দিবসটি ঘিরে সরকারি-বেসরকারিভাবে দেশের কোথাও উল্লেখযোগ্য কর্মসূচি নেওয়া হয়নি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যৌন হয়রানি সামাজিক ব্যাধি। এটি নির্মূল করতে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি সচেতনতামূলক কর্মসূচিও জরুরি। জড়িতদের কঠোর শাস্তির আওতায় আনা হলে এ অপরাধ নির্মূল করা সম্ভব।

মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) হিসাব অনুযায়ী, গত বছর এক হাজার ৪১৩ নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। ২০১৮ সালে এ সংখ্যা ছিল ৭৩২ জন। অর্থাৎ ২০১৯ সালে ধর্ষণের ঘটনা দ্ব্বিগুণ হয়েছে। ২০১৯ সালে ধর্ষণের পর হত্যার শিকার হন ৭৬ জন। আর আত্মহত্যা করতে বাধ্য হয়েছেন ১০ নারী। এ ছাড়া যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন ২৫৮ নারী। ২০১৮ সালে এই সংখ্যা ছিল ১৭০ জন। অন্যদিকে চলতি বছরের জানুয়ারি মাসেই ধর্ষণসহ নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ৩২৬ নারী। ধর্ষণের শিকার ১১৬ জন। তাদের মধ্যে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার ২০ জন। ধর্ষণের চেষ্টা করা হয়েছে ২৪ নারী ও শিশুকে।

বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারিতে নির্যাতনের শিকার ৩২৬ নারী ও শিশুর মধ্যে শ্নীলতাহানির শিকার হয়েছেন আটজন। যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ১০ জন। অগ্নিদগ্ধ হয়েছেন তিনজন। অপহরণের শিকার হয়েছেন ১৫ জন। নারী ও শিশু পাচারের সংখ্যা ২। বিভিন্ন কারণে ৪০ নারী ও কন্যাশিশুকে হত্যা করা হয়েছে। যৌতুকের কারণে তিন নারীকে হত্যা এবং নির্যাতনের শিকার ১৫ জন। শারীরিক নির্যাতনের শিকার ১০ জন এবং উত্ত্যক্তের শিকার সাতজন। উত্ত্যক্তের কারণে একজন আত্মহত্যা করতে বাধ্য হন। এ ছাড়া বিভিন্ন নির্যাতনের মাধ্যমে আত্মহত্যা করতে বাধ্য করা হয়েছে আরও ২১ জনকে। ১৭ জনের রহস্যজনক মৃত্যুর তথ্যও রয়েছে। গ্রাম্য ফতোয়ার শিকার চার নারী। বাল্যবিয়ে হয়েছে ১০ ও বাল্যবিয়ের চেষ্টা করা হয়েছে ৯ জনকে।

মহিলা ও শিশুবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ফজিলাতুন নেসা ইন্দিরা বলেন, সরকার নারী নির্যাতন প্রতিরোধে সবসময়ই সোচ্চার। সরকারের নানা উদ্যোগের ফলে জনগণের মধ্যেও সচেতনতা বৃদ্ধি পেয়েছে। হেল্পলাইন চালুর পর এ পর্যন্ত দেড় কোটি মানুষ সরকারি সেবার আওতায় এসেছে। তবে শুধু সরকারি উদ্যোগে নারী নির্যাতনের ঘটনার লাগাম টানা সম্ভব নয় জানিয়ে তিনি বলেন, এ জন্য দরকার সামাজিক প্রতিরোধ ব্যবস্থা। সবাইকে নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে সোচ্চার ভূমিকা রাখতে হবে।

মহিলা পরিষদের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সীমা মোসলেহউদ্দীন বলেন, নারী নির্যাতন প্রতিরোধে কঠোর আইন থাকলেও তা বাস্তবায়ন হচ্ছে না। এমনকি বিচারহীনতা ও বিচারের দীর্ঘসূত্রতার কারণে অপরাধীরা বারবার একই অপরাধ সংঘটিত করতে সাহস পাচ্ছে। যুবকদের মধ্যেই এ ধরনের অপরাধপ্রবণতা বেশি।

একই কথা বলেন জাতীয় কন্যাশিশু অ্যাডভোকেসি ফোরামের সভাপতি নাসিমা আক্তার জলিও। সরকারকে নারীবান্ধব উল্লেখ করে তিনি বলেন, নানা খাতে সমানতালে নারীরা এগিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু নারীর উন্নয়নের সমান্তরালে নির্যাতনের চিত্রও ভয়াবহভাবে বাড়ছে। সেই সঙ্গে নির্যাতনের ধরনও বদলাচ্ছে অপরাধীরা। এর অন্যতম কারণ বিচারহীনতার সংস্কৃতি।

নির্যাতনের ভিন্ন ধরন :বেসরকারি সংস্থা অ্যাকশন এইডের মতে, শহরাঞ্চলে ৮৮ শতাংশ নারী পথচারীদের আপত্তিকর মন্তব্যের শিকার হন। মুখরা, ঝগড়াটে, মাল (আকর্ষণীয় নারী), বন্ধ্য, পোড়ামুখীসহ কিছু শব্দ রয়েছে, যেগুলো দিয়ে নারীর কর্মদক্ষতা বা যোগ্যতা খাটো করা হয়। আবার কিছু শব্দ আছে, যেগুলোর পুরুষবাচক শব্দ বাংলা ভাষায় নেই। প্রতি তিনজনে একজন নারী সহিংসতার শিকার হন। যখন কারও ওপর শারীরিক নির্যাতন করা হয়, তখন তাকে মৌখিকভাবেও নির্যাতন মানে গালাগালও করা হয়। আর মানসিক নির্যাতন তো আছেই।

দৃষ্টিভঙ্গিও দায়ী :দেশে প্রতিটি নারী ও শিশু সহিংসতার ঝুঁকিতে রয়েছে বলে দাবি মানবাধিকার কর্মীদের। নারীবিদ্বেষী দৃষ্টিভঙ্গি ও সংস্কৃতি একদিকে নারীর ওপর সহিংসতা চালানোর প্রবণতা তৈরি করে, অন্যদিকে নির্যাতনের শিকার নারীকেই দোষারোপ করা হয়।

বেসরকারি সংস্থা নারীপক্ষের সাবিনা ইয়াসমিন বলেন, নারীর ওপর সহিংসতার মাত্রা, ধরন ও নিষ্ঠুরতা বেড়েছে বহুগুণ। সবচেয়ে ভয়াবহ ও উদ্বেগের বিষয় হলো, অনেকে ক্ষমতার দাপটে এতটাই বেপরোয়া যে, আইন-আদালত, প্রশাসন, জনগণের ক্ষোভ-বিক্ষোভ কোনো কিছুরই তোয়াক্কা না করে ধর্ষণ, যৌন নির্যাতন, হত্যাসহ নারীদের ওপর নির্যাতন-নিপীড়ন চালিয়ে যাচ্ছে।
জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ :নারী নির্যাতন প্রতিরোধে জাতীয় জরুরি সেবা চালু রয়েছে। নির্যাতনের শিকার যে কেউ টোল-ফ্রি ৯৯৯ নম্বরে কল করে সরকারি সেবা পেতে পারেন।




সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদক - তোফাজ্জল হোসেন
Mob : 01712 522087
ই- মেইল : [email protected]
Address : 125, New Kakrail Road, Shantinagar Plaza (5th Floor - B), Dhaka 1000
Tel : 88 02 8331019