করোনাভাইরাসে জনতুষ্টিবাদ কি হুমকিতে নাকি শক্তিশালী হওয়ার পথে

জয়যাত্রা ডট কম : 28/03/2020

জয়যাত্রা ডেস্ক :

সর্বশেষ বৈশ্বিক সংকট-পরবর্তীতে বিশ্বজুড়ে ক্ষমতা কাঠামোয় জেঁকে বসেছেন তারা। বলা হচ্ছে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের জনতুষ্টিবাদী রাজনীতিবিদ, সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধানদের কথা। চলমান এ করোনাভাইরাস মহামারীতে কি তারা শক্তিশালী হচ্ছেন, নাকি দুর্বল হচ্ছেন—এ নিয়ে ব্লুমবার্গের এই বিশ্লেষণী প্রতিবেদন।

২০০৮ সালের আর্থিক মন্দা-পরবর্তীতে বিশ্বজুড়ে নির্বাচনী ফলাফলে যেন ভূমিকম্প দেখা দেয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর রাজনৈতিক কাঠামো ও আদর্শে বড় একটি ধাক্কা খায়। নতুন এক লোকরঞ্জনবাদী রাজনীতির দেখা মেলে এবং তাদের বড় একটি অংশ যুক্তরাষ্ট্র ছেড়ে চীনের ছায়াতলে আশ্রয় নেয়। নভেল করোনাভাইরাস মহামারী কি সেক্ষেত্রে বাগড়া বসিয়ে দিল?

করোনাভাইরাসে বিশ্বজুড়ে যেখানে প্রতিদিনই মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে এবং বিশ্বের প্রায় অর্ধেক মানুষ লকডাউনের মধ্যে আছে, সেখানে তা মোকাবেলায় কোন সরকারগুলো রাজনৈতিকভাবে সংকটে পড়বে, এখনই তার পূর্বাভাস দেয়া যাচ্ছে না। কভিড-১৯-এর প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট জাইর বোলসোনারো কিংবা ইতালির বিরোধী নেতা মাত্তিও সালভিনির পদক্ষেপ তাদের মুখোশ উন্মোচন করবে, নাকি তাদের শক্তিশালী করবে তা বলার এখনো সময় আসেনি। একই কথা সত্য চীনের জন্যও। হুবেই প্রদেশের উহান থেকে শুরু হওয়া কভিড-১৯ মহামারীতে চীন কি ভূরাজনৈতিক সুবিধা আদায় করবে, নাকি ব্যর্থ হবে—তাও দেখার বিষয়।

জনতুষ্টিবাদী নেতারা যারা দেশকে অভিবাসীদের কারণে বিপদাপন্ন হিসেবে দেখিয়ে রাজনৈতিক ফায়দা লুটেছিলেন, করোনাভাইরাস তাদের সামনে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছে। অদৃশ্য এ ভাইরাস মহামারীর জন্য অ্যান্টি-এলিট, অ্যান্টি-ইমিগ্রান্ট কিংবা অ্যান্টি-সায়েন্স ন্যারেটিভ দাঁড় করানো যাচ্ছে না, যা এতদিন তাদের কাছে সফল রাজনৈতিক অস্ত্র ছিল। অন্যকে ভয় পাওয়ার চেয়ে মানুষ এখন নিজেকে নিয়েই ভয় পাচ্ছে বেশি।

চলমান পরিস্থিতিতে কোন ব্যবস্থা ও সমাজ টিকে থাকার জন্য অধিকতর যোগ্য, করোনাভাইরাস এ রকম একটি ডারউইনীয় পরীক্ষার সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। ভবিষ্যতে নাগরিকরা তাদের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত সত্যের ভিত্তিতেই নেবেন বলে মনে করেন দক্ষিণ কোরিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট প্রার্থী আহন চিউল সু। আগামী ১৫ এপ্রিল দক্ষিণ কোরিয়ার সংসদীয় নির্বাচন সামনে রেখে একটি রাজনৈতিক গ্রুপ গঠনের চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া সু বলেন, চলমান পরিস্থিতি এমন একটি রাজনৈতিক ল্যান্ডস্কেপ তৈরিতে সহায়তা করবে, যেখানে সাধারণ মানুষ জনতুষ্টিবাদী মতাদর্শে গা ভাসিয়ে দেবে না। ফলে জনতুষ্টিবাদী ওই রাজনীতিবিদ ও রাজনীতি তাদের ভিত খুঁজে পাবে না।

ইতালির লিগ পার্টির নেতা সালভিনির রাজনৈতিক ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত অঞ্চলগুলোই করোনাভাইরাসে মারাত্মক আক্রান্ত হয়েছে। শুরুতে তিনি বলার চেষ্টা করেছিলেন উত্তর আফ্রিকা থেকে আসা অভিবাসীদের থেকেই এ ভাইরাস ছড়িয়েছে, যদিও এর সমর্থনে কোনো প্রমাণ উপস্থাপন করতে পারেননি। করোনাভাইরাস মোকাবেলায় প্রধানমন্ত্রী জুজেপ্পে কন্তে তেমন কিছু করছেন না কিংবা পার্লামেন্ট আহ্বান না করে তিনি এলিটিস্ট সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন—সালভিনির এমন অভিযোগ হালে পানি পাচ্ছে না। জরুরি এ পরিস্থিতিতে ইতালীয়রা সরকারি প্রতিষ্ঠানের পেছনেই দাঁড়াচ্ছে। কন্তের কঠোর পদক্ষেপে তার সরকারের জনপ্রিয়তা রেকর্ড চূড়ায় পৌঁছেছে। একই ধরনের পরিস্থিতি দেখা যাচ্ছে জার্মানিতে। সিরীয় গৃহযুদ্ধ থেকে পালিয়ে আসা শরণার্থীদের আশ্রয় দিয়ে ডানপন্থীদের কড়া সমালোচনার মুখে পড়া অ্যাঙ্গেলা মেরকেলের ক্রিশ্চিয়ান ডেমোক্রেটিক ইউনিয়নের গত নির্বাচনে ভরাডুবি হয়েছিল। কিন্তু করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে শক্ত হাতে লড়াই করায় মেরকেল সরকারের জনপ্রিয়তা বেড়েছে। সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখা গেছে মেরকেল নেতৃত্বাধীন সরকারের জনপ্রিয়তা ৫ শতাংশীয় পয়েন্ট বেড়েছে।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প রাজ্য গভর্নরদের কড়া সমালোচনার মুখোমুখি হচ্ছেন। মার্কিন সিনেটে সদ্য ২ ট্রিলিয়ন ডলারের জরুরি সহায়তা প্যাকেজ অনুমোদিত হলেও কভিড-১৯ মোকাবেলায় দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ না করায় তার সমালোচনা করছেন গভর্নররা। আগামী ইস্টার সানডেতে গির্জাগুলো সব ভরপুর থাকবে এবং পুরো দেশ উন্মুক্ত হবে—ট্রাম্প যখন এ ইঙ্গিত দিচ্ছিলেন, তখন গত বৃহস্পতিবার করোনাভাইরাস সংক্রমণের দিক থেকে ইতালিকে ছাড়িয়ে গেছে যুক্তরাষ্ট্র। শুক্রবার চীনকেও ছাড়িয়ে গেছে যুক্তরাষ্ট্র। দেশটিতে কভিড-১৯ আক্রান্তের সংখ্যা সর্বশেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত ৮৫ হাজার ৭৫৫-তে দাঁড়িয়েছে এবং নিহতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৩০৪, যা প্রতিনিয়ত বাড়ছেই।

ভাইরাস সংক্রমণ সত্ত্বেও জীবনযাপন ও ব্যবসা-বাণিজ্য যথারীতি সচল থাকবে—এ রকম ঘোষণার পর ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট বোলসোনারোর বিরুদ্ধে প্রধান শহরগুলোয় বিক্ষোভ প্রদর্শন করে বাসিন্দারা। তারা তাদের বাসার বারান্দা ও জালানা দিয়ে হাঁড়ি-পাতিল ও কড়াই ঝুলিয়ে দেয়। করোনাভাইরাসে সংক্রমিত ও নিহতের সংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে খুবই দুর্বল হিসেবে আবির্ভূত হন ‘ট্রাম্প অব দ্য ট্রপিক’ হিসেবে পরিচিত বোলসোনারো। জনতুষ্টিবাদের আরেক প্রবক্তা যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন প্রথম কোনো সরকারপ্রধান হিসেবে করোনাভাইরাসে আক্রান্তের কথা জানিয়েছেন।

করোনাভাইরাস বিশ্বের রাজনৈতিক আকাশে কেমনতর পরিবর্তন আনতে পারে, তা নিয়ে যথেষ্ট ভাবার রসদ সরবরাহ করছে সাম্প্রতিক ঘটনাবলি। অতীতের অন্যান্য বৈশ্বিক সংকটের মতো কভিড-১৯ও হয়তো বিশ্বের রাজনৈতিক ক্যানভাস পাল্টে দেবে।




সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদক - তোফাজ্জল হোসেন
Mob : 01712 522087
ই- মেইল : [email protected]
Address : 125, New Kakrail Road, Shantinagar Plaza (5th Floor - B), Dhaka 1000
Tel : 88 02 8331019