৭৫-এর টার্গেট পূরণ করতেই গ্রেনেডহামলা

জয়যাত্রা ডট কম : 21/08/2020

নিজস্ব প্রতিবেদক :

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বীভৎস হত্যাযজ্ঞের কালো দিন আজ। ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ ও দুর্নীতিবিরোধী সমাবেশ চলাকালে একটি নৃশংসতম হত্যাযজ্ঞের শিকার হয়েছিল তৎকালীন বিরোধী দল আওয়ামী লীগ।
নেতাদের হত্যার উদ্দেশ্যে নারকীয় গ্রেনেডহামলা চালায় ঘাতক চক্র।

ভয়াল বিস্ফোরণে নিহত আর আহত নেতাকর্মীদের রক্তে মৃত্যুপুরীতে পরিণত হয়েছিল ২৩ বঙ্গবন্ধু এভিনিউস্থ কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনের সড়ক। রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সহযোগিতায় রাজনৈতিক সমাবেশে এ ধরনের নারকীয় হত্যাযজ্ঞ পৃথিবীর ইতিহাসে দ্বিতীয়টি নেই।

বর্বরোচিত গ্রেনেডহামলায় আওয়ামী লীগের মহিলাবিষয়ক সম্পাদক ও প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমানের সহধর্মিণী আইভি রহমানসহ ২৪ জন নেতাকর্মী শাহাদাত বরণ করেন। গ্রেনেডের স্প্লিন্টারের আঘাতে আহত হন চার শতাধিক নেতাকর্মী। আহত হন প্রিন্ট ও ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ার সাংবাদিকরা। আহত আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মী-সমর্থকদের অনেকে এখনো স্প্লিন্টারের আঘাত নিয়ে মানবেতর জীবন-যাপন করছেন।
বর্বরোচিত গ্রেনেডহামলায় নিহতরা হলেন— আইভি রহমান, নিরাপত্তারক্ষী ল্যান্স করপোরাল (অব.) মাহবুবুর রশীদ, আবুল কালাম আজাদ, রেজিনা বেগম, নাসির উদ্দিন সরদার, আতিক সরকার, আবদুল কুদ্দুস পাটোয়ারি, আমিনুল ইসলাম মোয়াজ্জেম, বেলাল হোসেন, মামুন মৃধা, রতন শিকদার, লিটন মুনশী, হাসিনা মমতাজ রিনা, সুফিয়া বেগম, রফিকুল ইসলাম (আদা চাচা). মোশতাক আহমেদ সেন্টু, মোহাম্মদ হানিফ, আবুল কাশেম, জাহেদ আলী, মোমেন আলী, এম শামসুদ্দিন এবং ইসাহাক মিয়া। মারাত্মক আহতরা হলেন— শেখ হাসিনা, আমির হোসেন আমু, প্রয়াত আব্দুর রাজ্জাক, প্রয়াত সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত, ওবায়দুল কাদের, প্রয়াত অ্যাডভোকেট সাহারা খাতুন, প্রয়াত মোহাম্মদ হানিফ, আফম বাহাউদ্দিন নাসিম, নজরুল ইসলাম বাবু, আওলাদ হোসেন, সাঈদ খোকন, মাহবুবা আখতার, অ্যাডভোকেট উম্মে রাজিয়া কাজল, নাসিমা ফেরদৌস, শাহিদা তারেক দিপ্তী, রাশেদা আখতার রুমা, হামিদা খানম মনি, ইঞ্জিনিয়ার সেলিম, রুমা ইসলাম, কাজী মোয়াজ্জেম হোসেইন এবং মামুন মল্লিক।

সেদিন অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে যান বঙ্গকন্যা বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। শেখ হাসিনাকে রক্ষায় মানবপ্রাচীর তৈরি করে প্রাণ উৎসর্গ করেছিলেন মোহাম্মদ হানিফসহ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। শুধু গ্রেনেড হামলাই নয়, সেদিন শেখ হাসিনাকে হত্যার উদ্দেশ্যে তার গাড়ি লক্ষ্য করে চালানো হয় ছয় রাউন্ড গুলি। ভয়াল এ গ্রেনেড হামলায় শেখ হাসিনা প্রাণে রক্ষা পেলেও তার শ্রবণশক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক কলঙ্কময় অধ্যায়ের জন্ম দেয়।

তৎকালীন বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের পরোক্ষ মদতে গ্রেনেডহামলা চালানো হয়। রাষ্ট্রের শীর্ষপর্যায় থেকে শুরু করে অনেকেই এ হামলার সঙ্গে জড়িত ছিলো। এই লোমহর্ষক গ্রেনেডহামলার ঘটনা ধামাচাপা, ভিন্ন খাতে প্রবাহিত ও আলামত নষ্টসহ জজ মিয়া নাটক সাজানো হয়। নিরীহ জজ মিয়াকে সামনে এনে মিডিয়া ট্রায়ালের মাধ্যমে ঘটনাটি ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করা হয়। যা পরবর্তীতে তদন্তের মাধ্যমে বেরিয়ে আসে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মূলত ওই দিনের গ্রেনেডহামলার মধ্য দিয়ে ১৯৭৫ সালের বঙ্গবন্ধুর সপরিবারের হত্যার যে মিশন, সেটাই সম্পূর্ণ করতে চেয়েছিল ঘাতকরা। ৭৫-র খুনি ও নেপথ্যের পৃষ্ঠপোষকদের অসমাপ্ত কাজের অংশ ছিলো ২১ আগস্ট।

দেশব্যাপী সন্ত্রাসবিরোধী ও বোমাহামলার প্রতিবাদে আয়োজিত সন্ত্রাসবিরোধী শান্তিপূর্ণ সমাবেশে এ ধরনের হামলা বিশ্ববিবেককে নাড়া দেয়। তদন্তে উঠে আসে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার জ্যৈষ্ঠপুত্র তারেক রহমান, একাত্তরের ঘাতক মানবতাবিরোধী যুদ্ধাপরাধী মতিউর রহমান নিজামী, আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ, বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর, বিএনপি নেতা সাবেক উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টু, জঙ্গিনেতা মুফতি হান্নানসহ মুক্তিযুদ্ধবিরোধী প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠীর নীলনকশায় সংঘটিত হয় গ্রেনেডহামলা। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াও হামলার পক্ষে ছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

তৎকালীন বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে এই মামলার সঠিক তদন্ত তো হয়নি, বরং ষড়যন্ত্রের হোতাদের রক্ষার উদ্দেশ্যে মামলাটি ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতে এবং আলামত ধ্বংস করার নানাবিধ ষড়যন্ত্র হয়েছে। সময়ের পরিক্রমায় এ ঘটনা নিয়ে দুটি মামলা চলমান থাকে। একটি হত্যামামলা এবং অপরটি বিস্ফোরক দ্রব্যাদি আইনের মামলা। দীর্ঘ ১৪ বছর পর ২০১৮ সালে মাননীয় আদালত ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার রায় প্রদান করে। আদালত এই দুই মামলার রায়ে জীবিত মোট ৪৯ জন আসামির মধ্যে ১৯ জনের মৃত্যুদণ্ড, ১৯ জনের যাবজ্জীবন এবং বাকি ১১ জনের বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দিয়েছেন। মামলাটি এখন উচ্চ আদালতে বিচারাধীন।
২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার মাস্টার-মাইন্ড বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানসহ পলাতক আসামি এবং দেশে ফিরিয়ে এনে আদালতের রায় কার্যকর করতে সরকারের প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। দাবি উঠেছে ৭৫ সালের ১৫ আগস্ট এবং ২১ আগস্টের নির্মম হত্যাকাণ্ডের খুনিদের ও পৃষ্ঠপোষকদের বিচারের আওতায় আনার।

আওয়ামী লীগের অন্যতম প্রেসিডিয়াম সদস্য কর্নেল (অব.) ফারুক খান এমপি বলেন, ২০০৪ সালের গ্রেনেডহামলা রাজনৈতিকভাবে পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। সেদিন সন্ত্রাসীদের প্রতিনিধিত্বকারী এবং পালনকারী বিএনপি-জামায়াত সরকার ভেবেছিল বঙ্গবন্ধুকন্যাকে হত্যা করলেই গণতন্ত্রের যাত্রা ব্যাহত হবে। সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে তারা দেশের ক্ষতি করতে চেয়েছিল। বাংলা ভাইয়ের মতো সন্ত্রাসীদের লালন পালন করেছেন। দেশের বিভিন্ন স্থানে একের পর এক বোমা হামলা করা হয়েছে। ২১ আগস্ট তাদের মূল পরিকল্পন ছিলো আওয়ামী লীগকে নেতৃত্ব শূন্য করা। দেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে শেষ করে দেয়া।

কিন্তু আল্লাহর রহমতে এবং নেতাকর্মীদের সাহসী ভূমিকার কারণে বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রাণে বেঁচে যান। শেখ হাসিনার বাঁচার কারণেই বাংলাদেশের গণতন্ত্র রক্ষা পেয়েছে। তার নেতৃত্বে আজ দেশ বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে। তিনি বলেন, ২১ আগস্টের কিছু আসামিকে শাস্তি দেয়া হয়েছে। কিছু এখনো বাদ রয়েছে। আশা করি বাকিদের আইনের আওতায় এনে বিচারের রায় কার্যকর করা হবে।

বাংলাদেশ যুবলীগের চেয়ারম্যান শেখ ফজলে শামস পরশ বলেন, ১৫ আগস্ট ছিলো সুপরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। ১৫ আগস্ট ছিলো জাতিকে ধ্বংস করার একটি নীল নকশা। ২১ আগস্ট আবার এই ষড়যন্ত্রকারীরাই বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে শেখ হাসিনাকে হত্যা করার জন্য গ্রেনেডহামলা করে। যেভাবে আমরা ৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের ঘাতকদের বিচার করেছি ঠিক সেভাবেই এর পেছনে যে ঘাতকরা আছে তাদের বিচার করা হবে।

যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান নিখিল বলেন, ১৫ আগস্ট, ২১ আগস্ট হামলা একই সূত্রে গাঁথা। ১৫ আগস্টের মাস্টার মাইন্ড ছিলেন জিয়াউর রহমান আর ২১ আগস্ট গ্রেনেডহামলার মাস্টার মাইন্ড ছিলেন খালেদা জিয়া ও তার ছেলে। এজন্য যুবসমাজ ও যুবলীগের একটাই দাবি— যারা এই হত্যাকারীদের পৃষ্ঠপোষক এবং যারা আশ্রয়-প্রশ্রয়দাতা এবং তাদের যারা পুনর্বাসন করে দিয়েছে সেই জিয়াউর রহমান ও বেগম খালেদা জিয়াকেও বিচারের আওতায় আনতে হবে।

সেদিনের সে ভয়াল দিনটি বাঙালি জাতি চিরদিন স্মরণ করবে। ২১ আগস্ট দিনটিকে ২০০৪ সালের পর থেকে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে উদ্ভাসিত বাংলাদেশের জনগণ গ্রেনেডহামলা দিবস হিসেবে পালন করে আসছে। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগও দিনটি যথাযথ মর্যাদায় পালন করে থাকে।

তবে এবার করোনা ভাইরাসের কারণে সামাজিক দূরত্ব মেনে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠন দিবসটি স্মরণ করবে। আজ শুক্রবার সকাল ৯টায় ২৩ বঙ্গবন্ধু এভিনিউস্থ কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে নির্মিত বেদীতে আওয়ামী লীগ, সহযোগী সংগঠন ও সামাজিক সংগঠনের উদ্যোগে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করা হবে।




সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদক - তোফাজ্জল হোসেন
Mob : 01712 522087
ই- মেইল : [email protected]
Address : 125, New Kakrail Road, Shantinagar Plaza (5th Floor - B), Dhaka 1000
Tel : 88 02 8331019