এখনও অসংখ্য অবৈধ গ্যাস সংযোগ বহাল

জয়যাত্রা ডট কম : 23/10/2020


নিজস্ব প্রতিবেদক :
নারায়ণগঞ্জের তল্লায় মসজিদে বিস্ফোরণের পর তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড (তিতাস গ্যাস) অবৈধ গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্নকরণ অভিযান জোরদার করলেও, রাজধানীসহ আশপাশের বিভিন্ন জেলায় এখনও অসংখ্য অবৈধ সংযোগ বহাল আছে। কোথাও বিজ্রের ওপর দিয়ে, কোথাও বা কাঁচা সড়কের ওপর দিয়ে মাইলের পর মাইল চলে গেছে এসব অবৈধ গ্যাস পাইপ লাইন। তিতাস গ্যাস সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জনবলের অভাবে একবারে সব অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা সম্ভব না হলেও পর্যায়ক্রমে তা করা হবে। তারা জানান, রাজধানী ও আশপাশের জেলাগুলোতে বেশকিছু অভিযান পরিচালনা করে অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে এবং জড়িতদের কারাদন্ড, অর্থদন্ডে দন্ডিত করা হচ্ছে। এছাড়া নিয়মিত মামলাও দায়ের করা হচ্ছে।

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপু সম্প্রতি (৭ সেপ্টেম্বর) বিতরণ কোম্পানিগুলোকে দুই মাসের মধ্যে সব অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্নকরণের নির্দেশ দিয়ে বলেন, কর্মকর্তাদের দুর্নীতি ও অসদাচরণের জন্যই রাজনীতিবিদদের বা সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে। তাই কোন বিভাগের কোন কোন কর্মকর্তা অবৈধ কার্যক্রমের সঙ্গে জড়িত তাদের তালিকা করা হচ্ছে বলেও জানান প্রতিমন্ত্রী বিপু।

জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগে সিনিয়র সচিব মো. আনিছুর রহমান গ্যাসের অবৈধ সংযোগ উচ্ছেদের বিষয়ে কিছুদিন আগে সংবাদকে বলেন, উচ্ছেদ অভিযান চলমান আছে। তবে করোনা মহামারীর কারণে একটু ধীর হয়ে গেছে। সিনিয়র সচিব বলেন, আমি সব বিতরণ কোম্পানিগুলোতে নির্দেশনা দিয়েছি, আলাদা আলাদা জোনভিত্তিক টিম করে দ্রুত সব অবৈধ সংযোগ উচ্ছেদ করার। স্থানীয় পর্যায়ে নানা চাপ ও বাধার বিষয়ে সিনিয়র সচিব মো. আনিছুর রহমার বলেন, শীঘ্রই সব অবৈধ সংযোগ উচ্ছেদ করা হবে। কোন ধরনের চাপের কাছে নতি স্বীকার করা হবে না।

মুন্সীগঞ্জের গজারিয়া, নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁসহ আরও কয়েকটি স্থানে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এখনও ওইসব এলাকায় অবৈধ গ্যাস সংযোগের পাইপলাইন দৃশ্যমান অবস্থায় আছে। গজারিয়া উপজেলায় মেঘনা ব্রিজসংলগ্ন জামালদী বাসস্ট্যান্ড থেকে যে সড়কটি বেইলি ব্রিজ হয়ে বড় ভাটের চর, টেঙ্গার চর গেছে, ওই বেইলি ব্রিজে এখনও অবৈধ সংযোগের পাইপ লাইন দৃশ্যমান। হোসেন্দী, নাজির চর, ফুলদী গ্রামেও চলছে অবৈধ গ্যাস সংযোগ। ফুলদী থেকে সোনারকান্দি হয়ে সোনালী মার্কেট পর্যন্ত নতুন করে অবৈধ পাইপ লাইন টানা হচ্ছে। অবৈধ সংযোগ দিতে প্রতিটি ঘর থেকে টাকা উঠানো হচ্ছে। এদিকে সোনারগাঁয়ের আনন্দবাজারের আশপাশের কয়েকটি গ্রামে অবৈধ গ্যাস লাইন থাকলেও মূল সংযোগ বিচ্ছিন্ন আছে। এলাকার প্রভাবশালীরা এই সংযোগ পুনরায় নিতে দৌড়ঝাঁপ করছেন। স্থানীয়দের কাছ থেকে চুলা প্রতি টাকা উঠানো হয়েছে। তবে সোনারগাঁয়ের অনেক এলাকায় এখনও অবৈধ সংযোগ চলছে। একই অবস্থা তিতাসের আওতাভুক্ত বেশিরভাগ এলাকায়।

তবে সম্প্রতি গাজীপুরে অবৈধভাবে গ্যাস সংযোগ দেয়ার মূল হোতা সোলাইমান ভূঁইয়া ওরফে সোলাইমান মুন্সীকে ১০ দিনের কারাদন্ড দিয়েছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। মঙ্গলবার (২১ অক্টোবর) গাজীপুর মহানগরীর চান্দরা, গাছা ও বোর্ডবাজার এলাকায় অভিযান পরিচালনা করে জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট উম্মে হাবিবা ফারজানা এ কারাদন্ড দেন। এছাড়া ওইসব এলাকার অনন্যা রহমানকে ২০ হাজার টাকা, হোসনে আরাকে এক লাখ, রাবেয়া আক্তারকে ৭০ হাজার, আয়নাল মিয়াকে ১০ হাজার, নূরজাহানকে ৫০ হাজার এবং হাসান স্টাইল অ্যান্ড ডিজাইন লিমিটেডের মালিক একে আজাদকে দুই লাখ টাকা জরিমানা করে তাৎক্ষণিকভাবে তা আদায় করা হয়। তিতাস গ্যাসের গাজীপুর আঞ্চলিক অফিসের ব্যবস্থাপক সুরুজ আলম জানান, অভিযানকালে ওই এলাকায় তিনটি স্পটে তৃতীয় বারের মতো অবৈধভাবে স্থাপিত দুই ইঞ্চি ব্যাসের আড়াই কিলোমিটার পাইপলাইনের সংযোগস্থলসহ ৩০০ মিটার পাইপলাইন অপসারণ করে গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়। এতে প্রায় ৫০০টি বাড়ির আনুমানিক ১ হাজার ৫০০ অবৈধ চুলার গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়।

এদিকে রোববার (১৮ অক্টোবর) অবৈধ গ্যাস সংযোগ প্রদান ও ব্যবহারের দায়ে গাজীপুরে তিনজনকে কারাদন্ড ও দু’জনকে অর্থদন্ড প্রদান করা হয। রাতে গাজীপুরের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. ইকবাল হোসেন ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে এ দন্ড প্রদান করেন। তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষ ও গাজীপুর জেলা প্রশাসন সদর উপজেলার মনিপুর, খাসপাড়া, পিরোজালী ও গিলগাছিয়া এলাকায় সকাল থেকে রাত পর্যন্ত যৌথ অভিযান ও ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করেন। এ সময় প্রায় ৫ কি.মি. এলাকার এক হাজার বাসার ২৫০০ চুলার গ্যাস লাইন বিচ্ছিন্ন করা হয় এবং দু’জনকে ৩৩ হাজার টাকা অর্থদন্ড প্রদান করা হয়।

তিতাস গ্যাস গাজীপুর আঞ্চলিক অফিসের ব্যবস্থাপক মো. সুরুজ আলম জানান, একই এলাকায় আগেও অভিযান পরিচালিত হয়েছিল। কিন্তু একটি প্রভাবশালী মহল রাতের আঁধারে আবারও অবৈধ সংযোগ দিয়ে গ্যাস ব্যবহার করতে থাকে। খবর পেয়ে তিতাস কর্তৃপক্ষ জেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় রোববার (১৮ অক্টোবর) ওই এলাকায় এ অভিযান পরিচালনা করে। এ সময় অবৈধ গ্যাস সংযোগ প্রদান করার মূলহোতা মো. হারুন মিয়াকে ৬০ দিন, মো. জাহাঙ্গীরকে ৪৫ দিন এবং মো. আতাউল্লাহকে ২১ দিনের কারাদন্ড প্রদান করা হয়। এছাড়া রানিজা বেগমকে ৩০ হাজার টাকা ও হাজেরা বেগমকে ৩ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।

সাভারের আশুলিয়ায় বাসান্ডবড়িতে দুই কিলোমিটার এলাকায় নেয়া ৬০০ অবৈধ গ্যাস সংযোগ বিছিন্ন করেছে সাভার তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষ। সেই সঙ্গে ১২ জন গ্রাহকের কাছ থেকে প্রায় ৫০ লাখ টাকা বকেয়া বিল আদায় করা হয়। গত ১৪ অক্টোবর আশুলিয়ার রশিদ মার্কেট ও মধ্য গাজিরচট এলাকায় এ অভিযান পরিচালনা করেন সাভার তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের ব্যবস্থাপক প্রকৌশলী আবু সাদাৎ মোহাম্মদ সায়েম। তিনি জানান, সকাল থেকে তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষ রশিদ মার্কেট ও মধ্য গাজিরচট এলাকায় অভিযান চালিয়ে ৬০০ অবৈধ গ্যাসের সংযোগ বিছিন্ন করে। এছাড়া কয়েকটি মূল পয়েন্ট থেকে মাটির নিচে থাকা গ্যাস সরবরাহের কয়েক হাজার পাইপ জব্দ করা হয়। পরে ব্যবহৃত রাইজার খুলে নিয়ে লাইনগুলো সিলগালা করে দেয়া হয়। সেই সঙ্গে বৈধ গ্যাস সংযোগ গ্রহকদের কাছ থেকে প্রায় ৫০ লাখ টাকার বকেয়া আদায় করা হয়।

সম্প্রতি এ ধরনের অভিযান রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা, নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদীসহ আরও কয়েকটি জেলায় চালানো হয়েছে। অভিযানে অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হচ্ছে। তবে কিছুদিন পর একটি চক্রের সহযোগিতায় আবার অবৈধ সংযোগ নিয়ে নিচ্ছে স্থানীয়রা।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, এতদিন তিতাসের কেন্দ্রীয় একটি শ্রেণীর ছত্রছায়ায়, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, ক্ষমতাসীনদের নেতা, স্থানীয় তিতাস কর্তৃপক্ষ, প্রশাসন ও পুলিশের যোগসাজশেই এসব অবৈধ সংযোগ বিস্তার লাভ করেছে। এখন সরকারের চাপে মারিয়া তিতাস অভিযান পরিচালানা করেও সব লাইন উচ্ছেদ করতে পারছে না। সবত্র অভিযান চালিয়ে সব অবৈধ সংযোগ উচ্ছেদে অনেক জনবলও প্রয়োজন, স্থানীয় প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদেরও সহযোগিতা প্রয়োজন। যা এখন পাচ্ছে না তিতাস। তবে সরকারের শীষ পর্যায় থেকে চাইলে সব গ্যাস সংযোগ সমূলে উচ্ছেদ করা সম্ভব।

জ্বালানি বিষেশজ্ঞরা বলেন, এখন সরকারের উচিত প্রিপেইড করে আবাসিক গ্যাস সংযোগ চালু করা। এছাড়া সব পাইপলাইনের গ্যাস সংযোগ প্রিপেইডে রূপান্তর করা। এতে জনগণ উপকৃত হবে এবং গ্যাসের সাশ্রয়ী ব্যবহারও নিশ্চিত হবে।




সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদক - তোফাজ্জল হোসেন
Mob : 01712 522087
ই- মেইল : [email protected]
Address : 125, New Kakrail Road, Shantinagar Plaza (5th Floor - B), Dhaka 1000
Tel : 88 02 8331019