Posted on

ইসলামিক ফাউন্ডেশন বগুড়ার ডিডি দায়িত্ব ফেলে তাবলীগে সময় কাটান বেশি


আব্দুল ওয়াদুদঃ ইসলামিক ফাউন্ডেশন বগুড়ার উপ-পরিচালক (ডিডি) আজমল হকের বিরুদ্ধে নানা অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। মসজিদের ইমামকে কানধরে ওঠাবসা করানো, সহকর্মীদের তাবলিগের চিল্লায় যাওয়া বাধ্যতামূলক করা, কোন কারণ ছাড়াই মসজিদ ভিত্তিক শিক্ষা কার্যক্রমের শিক্ষকদের চাকরিচ্যুৎকরাসহ অসংখ্য অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে।
ডিডি আজমল হকের বেশির ভাগ সময় কাটে তাবলিগের চিল্লায়। বর্তমানে তিনি বগুড়ার সোনাতলা উপজেলার বিভিন্ন জামে মসজিদে চিল্লায় অবস্থান করছেন। ফাটল ধরা তাবলিগের দুইগ্রুপের একটি গ্রুপের নেতৃত্বদেন তিনি। জোবায়ের পন্থি হিসেবে পরিচিত এই সরকারি কর্মকর্তা অফিসে সময় না দিয়ে প্রত্যন্ত গ্রাম অঞ্চলের মসজিদগুলোতে সময় দিয়ে একটি গ্রুপের পক্ষে জনমত গড়ে তোলার কাজ করছেন। এর আগে বগুড়ায় সাদ এবং জোবায়ের পন্থিদের মধ্যে মুখোমুখি সংঘর্ষে তিনি জোবায়ের পন্থিদের নেতৃত্ব দিয়েছেন। পুলিশ এমন তথ্য নিশ্চিৎ করেছেন। এদিকে গত ৩ এপ্রিল সোনাতলা উপজেলার আগুনিয়াতাইড় মিয়াপাড়া জামে মসজিদে উস্কানিমূলক বক্তব্যের জের ধরে মুসল্লিদের মধ্যে চরম উত্তেজনা দেখা দেয়। পরে রাতের আধারে তিনি ওই মসজিদ ত্যাগ করে পাশের গ্রামে সরদারপাড়া জামে মসজিদে চলে যান। বর্তমানে তিনি ওই মসজিদেই অবস্থান করছেন। এমন তথ্য জানিয়েছেন মসজিদে উপস্থিত একজন মুসল্লি সুমন মাস্টার। বগুড়ার শেরপুর উপজেলার মসজিদ ভিত্তিক শিশু ও গণশিক্ষা কার্যক্রমের শিক্ষক হাফেজ আব্দুল ওয়াহাব অভিযোগ করে বলেন, কিছুদিন আগে সামান্য একটি বিষয় নিয়ে ডিডি আজমল স্যার লোকজনের উপস্থিতিতে তাকে কান ধরে ওঠাবসা করান। এই ঘটনায় সাধারণ মানুষের মধ্যেও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। অবস্থান বেগতিক দেখে পরে বিষয়টি স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে মিমাংসা করেন ডিডি আজমল। একই কার্যক্রমের শিক্ষক গাবতলী উপজেলার বাগবাড়ির কোলারবাড়ি কেন্দ্রীয় জামে মসজিদের শিক্ষক সুলতানা ইয়াসমিন জানান, তিনি দীর্ঘদিন থেকে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের শিক্ষক হিসেবে কাজ করে আসছেন। হঠাৎ করে গত বছরের জুলাই থেকে তার বেতন বন্ধ করে দিয়েছেন ডিডি আজমল। কারণ জানতে চাইলে তিনি ওই শিক্ষককে বলেন- কাগজপত্র ঠিক নেই। ওই শিক্ষক ডিডির চাহিদা অনুযায়ী কাগজপত্র জমা দিলেও আজঅবধী তার বেতন বন্ধ রেখেছেন। ফলে ওই শিক্ষক চরমভাবে দৈন্যদশার মধ্যে পতিত হয়েছেন।
হাফেজ মাওলানা কামল হোসেন নন্দীগ্রামের ভাটারা জামে মসজিদে শিক্ষকতা করে আসছেন ২০০৬ সাল থেকে। কিছু দিন আগে তিনি তার বাড়ির কাছের একটি কেন্দ্রে বদলির জন্য আবেদন দেন ডিডি বরাবর। সেই দরখাস্ত দেয়ার পর চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে তার বেতনও বন্ধ করেন তিনি। কেন তার বেতন বন্ধ করা হয়েছে জানতে চাইলে ডিডি ওই শিক্ষককে বলেন তোমার চাকরি নেই। অন্য একজনকে ওই কেন্দ্রে চাকরি দেয়া হয়েছে। এমন কথা শোনার পর ভেঙ্গে পরেন ওই শিক্ষক। অনেক আকুতি মিনতি করেও তার চাকরি ফেরৎ পাননি। কোন অপরাধে তিনি চাকরি হারালেন সেটিও তার জানা নেই। এর আগেও ২০১৭ সালে আজমল ডিডি হিসেবে বগুড়ায় আসেছিলেন। সে সময় বগুড়া সদরের সুপারভাইজার জিয়াউর রহমানকে শয়তানের বাচ্চা বলে গালি দেন তিনি। এই গালির প্রতিবাদ করায় তাকে বিভিন্ন অভিযোগ তুলে চাকরি থেকে সাময়িক বরখাস্ত করেন। ওই ফিল্ড অফিসার চাকরি এখনো ফেরত পাননি। বিষয়টি আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছে। বগুড়া জেলা প্রশিক্ষক শাহআলম জানান, কোন কারণ ছাড়াই তাকে ডিমোশন দিয়ে শিবগঞ্জ উপজেলায় প্রেরণ করেছেন। এছাড়াও বগুড়া অফিসের একাধিক কর্মকর্তা কর্মচারি বলেছেন ডিডি আজমল তাদের সাথে সব সময় দুব্যবহার করে থাকেন। ভয়ে কেউ প্রতিবাদ করতে পারেনা। এদিকে ডিডি আজমল তার অধিনস্ত কর্মচারি এবং মসজিদ ভিত্তিক শিক্ষা কার্যক্রমের শিক্ষকদের বাড়িবাড়ি গিয়ে তাবলিগ জামাতে চিল্লায় অংশগ্রহনের জন্য চাপ সৃষ্টি করেন। যেতে না চাইলে ওই শিক্ষকদের চাকরি খাওয়ার হুমকিদেন। এমন অভিযোগও করেছেন অসংখ্য শিক্ষক। সোনাতলা উপজেলার দাউদপুর জামে মসজিদের শিক্ষক মাসুদ রানা বলেন, কিছু আগে ডিডি তার বাসায় আসেন। এসে তাকে বলেন তোমাকে চিল্লায় যেতে হবে। আগামী ১৮ এপ্রিল পরবর্তী চিল্লার তারিখ ঠিক করা হয়েছে সেই দিনের জন্য তুমি প্রস্তুত হও। ওই শিক্ষক আরো বলেন, আমার সদ্য জন্ম নেয়া সন্তানের কথা ডিডিকে জানানোর পরেও তিনি নাছোর বান্দা। চিল্লার জন্য তার থেকে উসুল (বুকিং মানি) আদায় করেছেন ডিডি আজমল। এছাড়াও সোনাতলা উপজেলার বিভিন্ন জামে মসজিদের শিক্ষক নূরুল আলম, মহসিন আলী, রেজাউল করিম, আশরাফুল আলমসহ অনেক শিক্ষকই জোর করে তাবলিগে যাওয়ার জন্য চাপ সৃষ্টির এমন অভিযোগ করেছেন। অভিযোগ করেছেন তাদের অনেকের থেকে অগ্রিম টাকা নেয়ারও।
এদিকে ডিডির বিরুদ্ধে স্বজনপ্রীতির অভিযোগও উঠেছে। কাহালু ও নন্দীগ্রাম উপজেলার ফিল্ড সুপারভাইজার মুহাম্মদ আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ পা ভেঙ্গে গতবছরে ২৪ ডিসেম্বর হাসপাতালে ভর্তি হন। দীর্ঘ দিন তিনি হাসপাতাল এবং বাড়িতে বিছানায় পড়ে ছিলেন। এজন্য তিনি ছুটি নেননি। অফিস না করলেও রীতিমত সব সুযোগ সুবিধা তিনি গ্রহণ করেছেন। শুধু কাহালু উপজেলায় তিনি ১৫ বছর ধরে কর্মরত আছেন। এসব বিষয় নিয়ে জানতে ইসলামিক ফাউন্ডেশন বগুড়ার উপ-পরিচালক আজমল হকের কার্যালয়ে একাধিকবার গেলেও তার দেখা পাওয়া যায়নি। অফিস কর্মীরাও জানিয়েছেন তিনি তাবলিগ জামাতের চিল্লায় আছেন। পরে মুঠোফোনে যোগাযোগ করলে তার ফোন বরাবরই বন্ধ পাওয়া যায়। সহকর্মীরা জানান, চিল্লায় থাকলে তিনি ফোন রিসিভ করেন না।