বয়ঃসন্ধিতে সন্তানের শারীরিক মানসিক যত্ন

অন্যরকম ডেষ্ক:

আমার ছেলের বয়স এখন পনেরো বছর। ইদানীং তার আচরণে কিছুটা পরিবর্তন এসেছে। অল্পতেই মন খারাপ করে। স্কুল বন্ধ, এই সময় সারাক্ষণ তাকে বাড়িতেই আটকে থাকতে হচ্ছে। পড়াশোনাও চলে অনলাইনে। ক্লাস ছাড়াও অনেকটা সময় চোখ আটকে আছে কম্পিউটারে, ল্যাপটপে অথবা মোবাইলের পর্দায় আর কানে আছে হেডফোন। খাবারেও অনীহা বেড়েছে, প্লেটে অল্পকিছু খাবার নিয়ে খাচ্ছে। আরেকটু বেশি খেতে বললে তার এক জবাব, বাইরে যেয়ে খেলতে পারি না, তাই ক্ষুধা লাগে না। একটু বেশি রাত জেগে অনলাইনে থাকায় ভোরে ঘুম থেকে জাগতে পারছে না। পুরো রুটিনটাই এলোমেলো। বন্ধুদের সাথে দেখা নেই, গল্প করা নেই, আউটডোরের খেলা বন্ধ। এই অবস্থায় পড়াশোনায় আগের সেই আগ্রহ ধরে রাখতে পারছে না। তবু চেষ্টা করে যাচ্ছি ছেলেকে সময় দিতে, ওর সাথে গল্প করে মনের কথাগুলো জানতে।

এ প্রজন্মের সন্তানকে প্রযুক্তি ব্যবহারে দক্ষ হতেই হবে। প্রযুক্তি থেকে দূরে রাখাটা কোনো কাজের কথা নয়। তাকে সময় ধরে প্রযুক্তি ব্যবহারের ব্যাপারে সচেতন করে তুলতে চেষ্টা করছি। নিজেও প্রযুক্তিগত জ্ঞান আহরণের চেষ্টা করি যাতে আমার সন্তান কি করছে তা বুঝতে পারি। সন্তান যখন গেম খেলে, তার পাশে যেয়ে বসি। নিজেও কিছুক্ষণ খেলি, এর মুখ্য কারণ সে কি খেলছে, কি করছে সে ব্যাপারে অবহিত হওয়ার পাশাপাশি তাকে সঙ্গ দেয়া। ছেলে কখনো লুকিয়ে মোবাইল বা ল্যাপটপ ব্যবহার করে না। যা করে আমাদের চোখের সামনেই। তাকে এমন পরিবেশ আমরাই দিয়েছি।

কিশোর-কিশোরী সন্তানদের নিয়ে কিছু না কিছু সমস্যায় ভুগছেন এমন অবস্থা এখন প্রায় সবার ঘরে ঘরে। আমার মেয়েটা ছেলের চেয়ে ১০ বছরের বড়। তার সাথে আমার সম্পর্ক ছিল বন্ধুর মতন, এখনো তাই আছে। মেয়েকে যেভাবে বেড়ে ওঠার সময়টায় গাইড দিয়েছি, ছেলেকে সেভাবেই দিতে চেষ্টা করছি। অনেক বাবা-মায়ের অভিযোগ, সন্তান কথা শোনে না। ডাইনিং টেবিলে বসে পরিবারের সবার সাথে খাবার খায় না। বাসার খাবার গ্রহণে অনীহা এবং বাইরের খাবার বিশেষ করে ফাস্টফুড খেতে পছন্দ করে। অনেক রাত জেগে অনলাইনে থাকে। হুটহাট নিজের রুমের দরজা বন্ধ করে দেয়। অনেক সন্তান রাগ সংবরণ করতে না পেরে চিৎকার,চেঁচামেচি করে। এই সমস্যা কেবল আমাদের দেশেই নয়, বিশ্বজুড়ে কিশোর বয়সের সন্তানের মধ্যে আচরণের নানা সমস্যা কমবেশি দেখা যাচ্ছে।

একটি গবেষণা প্রতিবেদন বলছে, ১৬ থেকে ১৮ বছর বয়সী জাপানি কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে সংবেদনহীনতা এবং নিয়ম না মানার প্রবণতা বাড়ছে। তাদের মধ্যে প্রায় ৮৫ শতাংশ অভিভাবকের কথার বিরোধিতা করে। ১৫-২৪ বছর বয়সী জাপানি কিশোর-কিশোরী এবং তরুণদের মধ্যে প্রায় দুই-তৃতীয়াংশই জীবনটা উপভোগ করছে না। ভারতের প্রায় ৫৫ শতাংশ কিশোর-কিশোরীর মধ্যে আবেগ নিয়ন্ত্রণের সমস্যা আছে। তাদের মধ্যে আচরণগত সমস্যা দেখা যায়। বাংলাদেশে ২০১৭ সালে পরিচালিত বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এক গবেষণায় দেখা গেছে, ১৩ থেকে ১৭ বছর বয়সী কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে ৫ শতাংশের আত্মহত্যার প্রবণতা আছে। ১১ শতাংশ একাকিত্বে ভোগে, ৮ শতাংশের কোনো বন্ধু নেই।

বর্তমানে যৌথ পরিবারের সংখ্যা একেবারেই কমে গেছে। একক পরিবারের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। পরিবার প্রতি সন্তান সংখ্যাও একজন কিংবা দুইজন। বাবা-মা ব্যস্ত থাকেন পেশাগত, সামাজিক কিংবা সাংসারিক ব্যস্ততায়। আগে যৌথ পরিবারের শিশুরা অনেক শিশুর সাথে, পরিবারের অনেক সদস্যের সাথে একত্রে বেড়ে ওঠার সুযোগ পেত। তাদের মধ্যে একাকিত্ব বোধ ছিল না বললেই চলে। তখন শিশুরা মাঠে যেয়ে খেলার সুযোগ পেত। শারীরিক ও মানসিকভাবে সুস্থতার সাথে বেড়ে উঠত। একক পরিবারের সন্তান নিঃসঙ্গতায় ভোগে। এটা তার মনোজগতে সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলে। আজকাল কিশোর-কিশোরীদের বড় অভিযোগ বাবা-মা ওদের বোঝে না। অনেক বাবা-মা জানেনও না সন্তান কিভাবে সময় কাটায়।

বয়ঃসন্ধিকাল একটা অদ্ভুত সময়। ছেলেমেয়েরা এই বয়সে পৌঁছলেই নানা সঙ্কট যেন তাদের জেঁকে ধরে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে ১০-১৯ বছর পর্যন্ত সময়টা কৈশোরকাল। এর মধ্যে যেকোনো সময়ে বয়ঃসন্ধিকাল আসতে পারে। চিকিৎসকদের মতে, মেয়েদের বয়ঃসন্ধিকাল ছেলেদের চেয়ে কিছুটা আগে শুরু হয়। মূলত ১০-১৩ বছরের মধ্যে যেকোনো সময় তা শুরু হতে পারে। ১০-১৯ বছর বয়সী প্রত্যেক কিশোর-কিশোরীর মধ্যে মনঃসামাজিক এবং শারীরিক পরিবর্তন অবশ্যম্ভাবী। এইসময় বাবা-মায়েরা সন্তানের আচরণ, লেখাপড়া, বন্ধুত্ব, আবেগ ইত্যাদি নিয়ে চিন্তিত থাকেন। কোনো বাবা-মা একটু বেশি নজরদারি করতে চান, যেটা দিনশেষে সন্তানের সামাজিক দক্ষতা বিকাশের অন্তরায় হয়ে যায়। অন্য দিকে কোনো বাবা-মা যদি সন্তানকে অধিক স্বাধীনতা দেন, সেটাও সন্তানকে বিগড়ে দিতে পারে। এই বয়সটা সামলে রাখার বয়স, একটু স্বাধীনতা চাওয়ার বয়স।

ইউনিসেফের সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার তিন কোটি ৬০ লাখ ১০-১৯ বছর বয়সের কিশোর-কিশোরী, যা এ দেশের মোট জনসংখ্যার ২২ শতাংশ। বয়ঃসন্ধিকালে এক ধরনের সামাজিক উৎকণ্ঠার কারণে অন্যের সামনে নিজেকে প্রকাশ করতে গিয়ে উৎকণ্ঠিত বোধ করে কিশোর-কিশোরীরা। তাদের আত্মবিশ্বাস কম থাকার কারণে এটি হয়। এ সময় বাবা-মায়ের উচিত সন্তানকে বিভিন্ন ধরনের সামাজিক পরিস্থিতির মুখোমুখি করে দেয়া। তাদের ছোটখাটো দায়িত্ব পালন করতে দিতে হবে। বয়ঃসন্ধির সময়টাতে ছেলেমেয়েদের মনে আত্মপরিচয় গড়ে উঠতে শুরু করে।

তাদের নিজস্ব সিদ্ধান্ত গ্রহণ করার জায়গা তৈরি হয়। পছন্দ-অপছন্দ, চাওয়া-পাওয়ার ইচ্ছে তৈরি হয়। নিজের সমাজ, সংস্কৃতি, ধর্ম সম্পর্কে তার নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে ওঠে। এ সময় তারা অনেক নতুন বন্ধুর সাথে মেশে। নতুন নতুন ফ্যাশনের দিকে মনোযোগী হয়। খাবারের প্রতি অনীহা দেখায় এবং কিশোরীরা কম খেয়ে ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখতে চায়। এই পর্যায়ে তারা পূর্ণাঙ্গ স্বাধীন মানুষ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। তাদের মধ্যে ভালো-মন্দের এমন একটা ধারণা তৈরি হয় যা খুব পরিপক্ব নয়। জীবনে গোপনীয়তা বজায় রাখতে চায়। স্নেহ-ভালোবাসার জন্য সর্বস্ব ত্যাগ করতে প্রস্তুত থাকে। পারিপার্শ্বিক পরিবেশের সাথে খাপ খাওয়াতে পারে না। বয়ঃসন্ধিতে শারীরিক পরিবর্তনের কারণে নিজেকে নিয়ে বিব্রত থাকে। অল্পতেই রেগে যায়।

বয়ঃসন্ধিতে ছেলেমেয়েদের উচ্চতা বাড়ার সাথে সাথে শারীরিক নানা পরিবর্তন আসে। হরমোনজনিত পরিবর্তনের কারণে ধাপে ধাপে আসে কৈশোর। মাসিক পিরিয়ড বা মেন্সট্রুয়েশন হলো মেয়েদের কৈশোরপ্রাপ্তির চূড়ান্ত ধাপ। সাধারণত ১২-১৩ বছর বয়সে শুরু হয় বালিকাদের পিরিয়ড। এইসময় তাদের মধ্যে ভীতি, দ্বিধা ও লজ্জা কাজ করে। আর যদি পিরিয়ডের সময় ব্যথা হয় তাহলে সেটা তার কাছে আরো ভীতিকর হয়ে ওঠে। কিশোরদের বয়ঃসন্ধিকাল আসে ১১-১৫ বছরের মধ্যে। এইসময় থেকে তাদের গলার স্বর ভাঙতে শুরু করে। মুখে গোঁফ-দাড়ি উঁকি দেয়, কাঁধ চওড়া হয়, পেশি সুগঠিত হয়। বয়ঃসন্ধিতে ছেলেমেয়েদের প্রজননক্ষমতা বিকাশ হতে থাকে। তারা বিপরীত লিঙ্গের প্রতি আকর্ষণ বোধ করে। বয়ঃসন্ধিতে শারীরিক পরিবর্তনগুলো যে স্বাভাবিক এবং এটা যে গ্লানির না সে বিষয়ে ছেলেমেয়ে দু’জনকেই আশ্বস্ত করতে হবে। এ পরিবর্তনের সময় সন্তানকে স্বাস্থ্য সচেতন থাকার কথা অবশ্যই মা-বাবাকেই বলতে হবে। সন্তান যেন অন্যের কাছ থেকে না শোনে। এতে ভুল কিছু শেখার আশঙ্কা থাকে।

কিশোরীদের মধ্যে হরমোনের প্রভাবে আবেগের প্রাবল্য দেখা দেয়। তখন তারা মানসিক ভাঙা-গড়ার মধ্য দিয়ে যায়। মুড সুইংয়ের কারণে মন মেজাজ খুব দ্রুত ওঠানামা করে। আনন্দ, রাগ, দুঃখ অনুভূতিগুলোর দ্রুত পরিবর্তনের মধ্যে চলতে থাকে। এই মন ভালো তো পরক্ষণেই মনখারাপ ভর করে। আপনার কাছে গুরুত্বহীন এমন একটি ছোট বিষয় নিয়ে সে উচ্ছ্বসিত হতে পারে। তাকে নিরুৎসাহিত করবেন না। তার আবেগ ও উচ্ছ্বাসকে মূল্য দিন। কোনো কারণে তার মন খারাপ হলে, কি হয়েছে জিজ্ঞাসা করে করে ব্যতিব্যস্ত না করে তাকে আবেগ প্রকাশের সুযোগ দিন। জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য জরিপ অনুযায়ী ৭-১৭ বছর বয়সী ১২ শতাংশ শিশু মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগছে। ইউনিসেফের মাতৃ ও কৈশোর স্বাস্থ্যসেবার স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েমের এক বক্তব্য থেকে জানা যায়, মানসিক সমস্যার কারণে নানা ধরনের প্রভাব পড়ে। বাংলাদেশে ৪ শতাংশ ছেলে ও ৬ শতাংশ মেয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করে। ১০ দশমিক ৬ শতাংশ মানুষের যেকোনো ধরনের মানসিক সমস্যা আছে। মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা থাকা মানুষদের মধ্যে ৯৪ দশমিক ৪ শতাংশের চিকিৎসার সুযোগ নেই।

করোনায় স্কুল বন্ধ থাকায় কিশোর-কিশোরীদের মানসিক চাপ আগের তুলনায় বেড়েছে। কিন্তু এটাই সত্য, স্কুল চালু থাকা অবস্থাতেও ১-১৪ বছর বয়সী শিশুদের মধ্যে ৮৮ দশমিক ৮ শতাংশ কোনো না কোনোভাবে শাস্তির শিকার হয়। করোনার কারণে কিশোর-কিশোরীরা ভালো নেই। তাদের কথা বলার জায়গা নেই। কিশোর-কিশোরীদের মনে এমন অনেক কথা থাকে যা তারা মা-বাবাকে বলতে পারে না। বন্ধুদের সাথে তারা অনেক কথার আদান-প্রদান করতে পারে। করোনায় স্কুল বন্ধ থাকায় তাদের মধ্যে হতাশা কাজ করছে। কেবল অনলাইনে ক্লাস করা যথেষ্ট নয়।

কয়েকজন অভিভাবকের সাথে কথা বলে জানা গেছে করোনার কয়েকমাসে বাইরের পৃথিবীর সাথে কিশোরী মেয়ের সম্পর্ক ছিল না বললেই চলে। তাদের বন্ধুদের সাথেও যোগাযোগ অনেক কমে গিয়েছিল। ফলে করোনার প্রথম কয়েক মাস তাদের মধ্যে হতাশা লক্ষ্য করা গেছে। তবে বর্তমানে অ্যাসাইনমেন্ট জমা দিতে বিদ্যালয়ে গেলে পুরনো বন্ধুদের সাথে সাক্ষাতে তাদের মধ্যে আনন্দ এবং হাসিখুশি ভাব দেখা গেছে। করোনা পরিস্থিতির দ্বিতীয় ঢেউ আমাদের দেশেও এসে লেগেছে তাই যথার্থ কারণেই স্কুল বন্ধ আছে। স্কুলে স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরিয়ে এনে কিভাবে স্কুল খুলে দেয়া যায় তা নিয়ে সরকারকে ভাবতে হবে।

মনোচিকিৎসকদের মতে, কিশোর-কিশোরীর মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা সমাধানে মা-বাবার ও পরিবারের সদস্যদের ভূমিকা সবচেয়ে বেশি। সন্তানের মনস্তত্ত্ব বুঝতে হবে। তাদের সাথে তর্কে লিপ্ত হওয়া যাবে না। কোনভাবেই গায়ে হাত তোলা যাবে না। ছেলেমেয়েরা যা বলবে তাই মেনে নিতে হবে ব্যাপারটা এমন নয় বরং সন্তানের পছন্দ-অপছন্দ বুঝে, তাদের সম্মানে আঘাত না করে ভালো-মন্দটা বুঝিয়ে বলতে হবে। ছেলেমেয়েদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তায় শ্রদ্ধাশীল থাকতে হবে। তাদের বন্ধুদের সামনে বা অন্যদের সামনে কটু কথা বললে তারা অপমানিত বোধ করে। কারও সাথে প্রেমের সম্পর্ক তৈরি হলে রাগারাগি না করে বিষয়টি নিয়ে তার সাথে আলোচনা করুন। কথা বলার ধরন, কাজ, পরীক্ষার ফলাফল কোনোকিছু নিয়েই তাকে ভাইবোনের বা বন্ধুদের বা অন্য ছেলেমেয়েদের সাথে তুলনা করা যাবে না। তার বন্ধুদের নিয়ে নেতিবাচক মন্তব্য করা যাবে না। তাকে সন্দেহ করে তার ব্যাগ চেক করা, মোবাইল চেক করা, লুকিয়ে ডায়েরি পড়া এগুলো একদম করা যাবে না। তাহলে সন্তান বাবা-মায়ের প্রতি বিশ্বাস হারিয়ে অবাধ্য হয়ে ওঠে।

ছেলেমেয়েদের কোনো নিয়মে কঠিনভাবে বেঁধে ফেলাটা অনুচিত। কৈশোরে তারা অনেক বেশি কৌতূহলপ্রবণ থাকে বিধায় বিপথগামী হওয়ার, মাদকের নেশায় জড়িয়ে যাওয়ার, অপসংস্কৃতিতে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি থাকে। বাবা-মাকে সন্তানের সাথে বন্ধুর মতন মিশতে হবে যাতে সন্তান যেকোনো সমস্যায় অভিভাবককে ভয় না পেয়ে নিজের কথাগুলো শেয়ার করতে পারে। মাদকের নেতিবাচক বিষয় নিয়ে তার সাথে খোলামেলা আলাপ করুন। শিশুদের একটু একটু করে ছাড় দিতে হবে। এতে তাদের মধ্যে আত্মবিশ্বাস গড়ে উঠবে। কৈশোরে মানসিক বিকাশের জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে সামাজিক সংগঠনের সচেতন ভূমিকা পালন করতে হবে। লেখাপড়াসহ বিভিন্ন কারণে সন্তানের স্ট্রেস বা মানসিক চাপ তৈরি হতে পারে। তার স্ট্রেস কমাতে সুস্থ বিনোদন চর্চা, গুণগত পারিবারিক সময়ের প্রয়োজন। তা না হলে মাদকগ্রহণ, বিকৃত যৌন আচরণ, পর্নোগ্রাফি ইত্যাদির মাধ্যমে নিজের চাপ কমানোর চেষ্টা করবে। তাই গান, নাচ, বই পড়া, বেড়াতে যাওয়া, খেলাধুলার মতন সুস্থ বিনোদন চর্চার মাধ্যমে এবং পারিবারিকভাবে সময় কাটানোর জন্য তাকে উৎসাহিত করুন।

যেহেতু বয়ঃসন্ধিকালে ছেলেমেয়েদের মধ্যে নানা শারীরিক-মানসিক পরিবর্তন আসে, এইসময় পরিবর্তনের দিকগুলো নিয়ে তাদের সাথে খোলামেলা আলোচনা করলে তারা ঘাবড়ে যাবে না। সন্তান ছেলে হোক বা মেয়ে, তার যৌন সহিংসতার মুখোমুখি হওয়ার ঝুঁকি আছে। পাশাপাশি সে নিজেও যৌন অপরাধে জড়িয়ে পড়তে পারে। সে যেন যৌন নিগ্রহের মুখোমুখি না হয়, আবার যেন নিজে যৌন নিপীড়ক হয়ে না ওঠে সেজন্য তাকে সব ধরনের ট্যাবু থেকে দূরে রাখুন। এ জন্য তার বয়স অনুযায়ী বিজ্ঞানসম্মত যৌনতা নিয়ে কথা বলুন। কিশোর-কিশোরীদের জন্য প্রজনন স্বাস্থ্য, মানসিক, সামাজিক ব্যাপারে কাউন্সেলিং করতে পারলে সেটা সুফল আনবে। আমাদের মনে রাখতে হবে, যৌন বিষয় না জেনে কোনো সন্তান কখনোই বড় হয়ে উঠবে না। কোনো না কোনোভাবে সে জানবেই। অবৈজ্ঞানিক আর বিকৃত পর্নোগ্রাফির ওয়েবসাইট বা অশিক্ষিত কারও কাছ থেকে এসব বিষয়ে জানার আগেই আপনি বিজ্ঞানসম্মতভাবে সন্তানের কাছে ব্যাখ্যা করলে সে নিরাপদ থাকবে। শারীরিক সম্পর্কের প্রতি কিশোর বয়সের কৌতূহল মাথায় রেখে সন্তানকে ছোটবেলা থেকেই সতর্ক করুন। যৌন নিরাপত্তার বিষয়গুলো তাকে ছোটবেলা থেকেই শেখানোর চেষ্টা করতে হবে।

বাবা-মায়ের মধ্যে যদি নৈতিকতার চর্চা না থাকে, মানবিক গুণাবলি না থাকে তবে সন্তানের মধ্যে অনৈতিকতা আর বিকৃতি তৈরি হবে। সব ধরনের অনৈতিকতা থেকে অভিভাবকদের দূরে থাকতে হবে। পেশাগত জীবনে বাবা-মা যদি অসৎ হন তার ছায়া সন্তানের উপর পড়বেই। ফলে সন্তান চিন্তা আর আচরণে বিকৃত, অসৎ এবং আত্মধ্বংসী হয়ে উঠবে।
সন্তানকে বুঝিয়ে বলুন অপছন্দের বিষয়ে ‘না’ বলতে পারাটাই স্মার্টনেস। সন্তানকে রাষ্ট্র, সমাজ, রাজনীতি, চারপাশে যা ঘটছে সেসব ভাবনা থেকে দূরে রাখবেন না। সেগুলোর ভালো-মন্দ সব তাকে জানতে দিন। তার সাথে আলোচনা করুন। এতে সন্তান যেখানেই থাকুক সেটা দেশে বা বিদেশে, স্বকীয় ভাবনার দিক থেকে সে প্রতিবন্ধী হয়ে উঠবে না।

আমরা যারা বাবা-মা, আমাদের উচিত পরিবারের সবার প্রতি সম্মান দেখানো। পরিবারের গুরুজনদের সাথে সম্মানের সাথে আচরণ করতে হবে। গৃহকর্মী, দারোয়ান, মালি, ড্রাইভারের সাথে সুন্দর আচরণ করতে হবে, যাতে তাদের প্রতি সন্তানের আচরণ সুন্দর হয়। কারো সাথে তাচ্ছিল্যপূর্ণ ব্যবহার করবেন না। নারী সদস্যদের প্রতি এমন আচরণ করুন যাতে আপনার কিশোর ছেলেটি তা থেকে ভালো শিক্ষা পায়। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব মানুষকে মানুষ ভাবতে শেখান। অন্য ধর্মকে শ্রদ্ধা করতে শেখান এবং সন্তানকে নিজ ধর্ম পালনে উৎসাহিত করুন।
পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকা, পুষ্টিকর খাবার খাওয়া এবং প্রজননতন্ত্রের সংক্রমণ ও রোগ সম্পর্কে জ্ঞানদানের ব্যবস্থা করলে কিশোর-কিশোরীদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য সহায়ক হবে।

ইউনিসেফের মতে, বাংলাদেশে বয়ঃসন্ধিতে বেশির ভাগ ছেলেমেয়ে অপুষ্টিতে ভোগে। তাদের স্বাস্থ্য সম্পর্কে পরিবারকে সচেতন থাকতে হবে। কিশোর-কিশোরী উভয়ের জন্য প্রোটিন, ক্যালসিয়াম, কার্বোহাইড্রেট, জিংক, আয়োডিন, আয়রন সমৃদ্ধ খাবার খাওয়ানোর পরামর্শ দেন পুষ্টিবিদরা। অনেক সময় টিন এজ সন্তান খাবার গ্রহণে অনীহা দেখায়, অযথা বেশি রেগে যায়, মাদক গ্রহণ শুরু করে, পশুপাখির প্রতি নির্দয় আচরণ করে, পরিবারের সদস্যদের শারীরিকভাবে আঘাত করে, সারা রাত জেগে থেকে দিনে ঘুমায়। এর সবই মানসিক সমস্যার লক্ষণ হতে পারে।

এই বিষয়গুলো সন্তানের মধ্যে দেখা দিলে প্রয়োজনে মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিতে হবে। আগামী দিনের উপযোগী একজন মানবিক বোধসম্পন্ন মেধাবী নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে প্রয়োজন সন্তানের শরীর- মনের সঠিক যত্ন নেয়া।