নিজস্ব প্রতিনিধি:জ্ঞান, দক্ষতা, পরিশ্রম আর উদ্ভাবনী ক্ষমতার ওপর নির্ভর করে পেশাজীবীরা নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানের অগ্রগতিতে ভূমিকা রাখার পাশাপাশি আর্থিক সুযোগ-সুবিধা ও প্রতিষ্ঠানের মালিকানায় অংশগ্রহণ করার সুবিধা উপভোগ করার জন্য নিজেকে উজাড় করে দিনরাত কষ্ট করতে থাকেন কর্মীরা।
শিল্পবিপ্লবের প্রাথমিক যুগ থেকে আজ অবধি উন্নত বিশ্ব বা দেশের ভিতরে ভালো ভালো আর্থিক ও অ-আর্থিক প্রতিষ্ঠানে কর্মরত কর্মকর্তা বা কর্মচারীদের কর্মদক্ষতা ও প্রযুক্তি জ্ঞানের ক্রমবিকাশের দিকে খেয়াল করলে দেখা যাবে যে কর্মকর্তারা যোগ্যতা ও দক্ষতা অনুযায়ী কাজের সুযোগ, বেতন-ভাতা ও আনুষাঙ্গিক সুযোগ-সুবিধার কারণে প্রতিষ্ঠানকে নিজের মনের করার পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানের সার্বিক অগ্রগতির জন্য প্রয়োজনের সময় সবকিছু ছেড়ে প্রতিষ্ঠানের স্বার্থে ঝাঁপিয়ে পড়েন।
প্রতিষ্ঠানও তার সর্বোচ্চ ত্যাগস্বীকারকারী কর্মীবাহিনীকে পুরস্কৃত করার পাশাপাশি নতুনদের মাঝে এই বার্তা পৌঁছে দেয়ার চেষ্টা করেন যে যারা ভালো কিছু করার জন্য নিবেদিতপ্রাণ তাদের দেখবার দায়িত্ব প্রতিষ্ঠানের নিজের।
অর্থনীতি ও ফাইন্যানশিয়াল সেক্টর বা দেশের ক্যাপিটাল মার্কেট সম্পর্কে যারা মোটামুটি ধারণা রাখেন তারা সবাই জানেন যে যেকোনো দেশের সার্বিক অগ্রগতিতে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের সবচেয়ে সুগম ও সহজলভ্য মাধ্যম হিসেবে সারা পৃথিবীতে পরিচিত হলো পুঁজিবাজার বা ক্যাপিটাল মার্কেট।
যে দেশের পুঁজিবাজার যত ভালো সে দেশের অর্থনীতি তত চাঙ্গা হওয়াটা খুব স্বাভাবিক। দুর্ভাগ্যবশত, বাংলাদেশে সৃষ্টির অনেক আগে অর্থাৎ ১৯৫৪ সালের ২৮ এপ্রিল দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের জন্ম হয়ে ইতিমধ্যে ৭৩টা বছর পার করলেও দেশের অর্থনীতিতে কাঙ্খিত ভূমিকা রাখা তো দূরের কথা নিজের অস্তিত্ব জানান দেয়া-সহ নিজের একটা ভালো পরিচিতি বা ব্রান্ড ইমেজ তৈরি করতে নজিরবিহীন ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ পিএলসি।
আইনের ভাষায় দেখলে কোনো পাবলিক লিমিটেড কোম্পানি বা যৌথ মূলধনী কোম্পানি কৃত্রিম ব্যক্তিসত্ত্বা বা জুরিডিকাল পারসন। অর্থাৎ কোনো কোম্পানি একবার শুরু হলে তা আজীবন চলবে বলে ধরে নেয়া হয়। কিন্তু ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ পিএলসি যেভাব খুড়িয়ে খুড়িয়ে চলছে তাকে আসলে ভালোভাবে চলা বলা যাচ্ছে না।
ডিএসইর এই অচলতা, অনগ্রসরতা, কর্মীদের ভিতরে কর্মস্পৃহার অভাব, প্রমোশন জটিলতা বা যোগ্যতা অনুযায়ী কাজ না পেয়ে ওএসডিতে থাকা কর্মকর্তাদের মতো অলস সময়কাটানো-সহ বেশিরভাগ সমস্যার জন্য দায়ী ব্যক্তি আর কেউ না প্রতিষ্ঠানটিতে দেড় যুগের কাছাকাছি জগদ্দল পাথরের মতো চেপে বসা বর্তমান প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা মোহাম্মাদ আসাদুর রহমান।
সময়ের সাথে রং বদলানো ও সুবিধাবাদী চরিত্রের এক উজ্জল নিদর্শন মোহাম্মদ আসাদুর রহমান তার নিজ স্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য এমন কোনো কৌশল নেই যা অবলম্বন করেন নি। ২০১০ সালে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের সাবেক সচিব শেখ মোহাম্মদ উল্লাহর হাত ধরে ডিএসইতে সহকারী মহাব্যবস্থাপক হিসেবে চাকরি নেয়ার পর প্রভাবশালী মেম্বারদের সাথে লিয়াজো করে একের পর এক বিদেশ সফর করার পাশাপাশি তুলনামূলক কম যোগ্য কিন্ত অসম্ভব অনুগত ও তোষামোদকারী একটা গ্রুপ এমনভাবে গঠন ও প্রথম সারির ডিপাটমেন্ট ও ডিভিশনগুলো নিজের আয়ত্বে নিয়েছেন যে প্রতিষ্ঠানের নতুন এমডি নুজহাত আনোয়ার ইচ্ছা থাকা সত্ত্বে ভালো কিছুৃ করতে পারবেন না।
আইন-কানুনের তোয়াক্কা না করে অসাধু উদ্দেশ্য সাধন করার জন্য একদিকে যেমন ট্রেক এফেয়ার্স ডিপাটমেন্ট ও মার্কেট অপারেশনসের মতো অসম্ভব গুরুত্বপূর্ণ ডিপাটমেন্ট রেগুলেটোরি এফেয়ার্সের বাইরে রেখে নিজের অনুগত মানুষ দিয়ে চালানোর মধ্য দিয়ে সরাসরি নিজে সবকিছু কন্ট্রোল করছেন অন্যদিকে রেগুলেটোরি এফেয়ার্স ডিভিশনের ভিতরে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুটো ডিপাটমেন্ট অর্থাৎ লিস্টিং ও সারভেইলান্স ডিপাটমেন্টে অনভিজ্ঞ কিন্তু নিজের অনুগত ও পছন্দের মানুষকে বসিয়ে পুঁজিবাজারের সর্বনাশে ভূমিকা রাখছেন মোহাম্মাদ আসাদুর রহমান।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে বেশ কয়েকজন উপ-মহাব্যবস্থাপক এই প্রতিবেদককে বলেছেন যে আলোচ্য ডিপাটমেন্টগুলো চালানোর মতো অসম্ভব যোগ্য ও দক্ষ মানুষ ডিএসইতে থাকার পরও মোহাম্মদ আসাদুর রহমান বর্তমান এমডি নুজহাত আনোয়ার যোগদান করার মাত্র মাসখানেক আগে কর্মকর্তাদের ট্রান্সফার করার মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ দুটো ডিপাটমেন্ট নিজের দখলে নিয়েছেন।
অন্যদিকে শুধুমাত্র নিজের রাগ ও খামখেয়ালিপনা চরিতার্থ করার জন্য সিনিয়র অনেক কর্মকর্তাকে তুচ্ছ কাজে ইনগেইজ করা অর্থাৎ কর্মহীন অবস্থায় ফেলে রেখেছেন যাতে আস্তে আস্তে ছাঁটাইয়ের তালিকায় নাম অন্তুর্ভুক্তির মাধ্যমে এসব কর্মকর্তা চাকরি হারান।
দুই দশক বা তিন দশক টানা কাজ করা মানুষগুলো কোথায় যাবেন বা কী করবেন তার কোনো চিন্তাভাবনা ছাড়াই লোকবল কমানোর নীলনকশার পাশাপাশি নিজের চাকরি দীর্ঘস্থায়ী করার জন্য কতিপয় ট্রেকহোল্ডার পরিচালক ও স্বতন্ত্র পরিচালকদের সাথে মিলেমিশে লোকবল কমানোর এই চক্রান্ত সুনিপুণভাবে বাস্তবায়নের কাজ এগিয়ে নিচ্ছেন।
কিন্তু অসম্ভব ধূর্ত ও চালাক স্বভাবের কারণে নিজে সরাসরি দৃশ্যপটে না থেকে নতুন এমডি নুজহাত আনোয়ার ও মানবসম্পদ বিভাগের নতুন মহাব্যবস্থাপক হাসান তাকের চৌধুরীকে সামনে দিয়ে নিশ্চিন্ত জীবন কাটাচ্ছেন যাতে দোষটা নিজের ঘাড়ে না আসে।
পুরোনো কর্মকর্তাদের ভিতর তুলনামূলকভাবে ভালো ও সবাইকে নিয়ে চলার নীতি অনুসরণ করা একজন মহাব্যবস্থাপককে ম্যানেজমেন্ট কমিটি থেকে বাদ দেয়া জন্য সম্প্রতি ম্যানেজমেন্ট কমিটি ঢেলে সাজানোর নামে সব মহাব্যবস্থাপককে বাদ দেয়া হয়েছে।
লোকবল ছাঁটাইয়ের সাথে নিজের কোনো হাত নেই এমন বিষয়টি সবার মনে ধারণা দেয়ার জন্য পরিচালকদের সাথে আতাত করে বোড মিটিংয়ে সি-লেভেলের কর্মকর্তাদেরকেও অংশগ্রহণ করতে দেয়া হয় না কিন্তু মানবসম্পদ বিভাগের কর্মকর্তা হাসান তারেক চৌধুরী অবাধে সব মিটিংয়ে অংশগ্রহণ করার পাশাপাশি নিজেকে অসম্ভব প্রভাবশালী একজন হিসেবে নিজের জায়গা পাকা করে নিয়েছেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন উপ-মহাব্যবস্থাপক বলেছেন যে মোহাম্মাদ আসাদুর রহমান চুক্তিভিত্তিক হলেও ডিএসইর চাকরি ছাড়বেন না।
যেকোনো উপায়ে নবায়ন করে বা আবার নিয়মিত হবার চেষ্টা করে যেকোনোভাবে থেকে যাবার সব চেষ্টা করবেন যে কারণে লোকবল ছাঁটাইয়ের কাজে নিজের নাম সরাসরি জড়াতে চাচ্ছেন না কারণ তাতে ভতিষ্যতে কর্মকর্তা বা কর্মচারীরা তাকে বিপদে ফেলে দিতে পারেন বা নিজে অস্বস্তিতে পড়বেন।
দেশ স্বাধীন হওয়ার অনেক আগেই যাত্রা শুরু করা প্রতিষ্ঠানটিতে কর্মীদের প্রমোশনের বিষয়ে প্রচলিত বিধান অর্থাৎ বিভাগীয় প্রধান ও ডিভিশনাল হেডের সুপারিশে সবকিছু চূড়ান্ত হওয়ার বিধান থাকলেও মোহাম্মাদ আসাদুর রহমানের অনুগত নয় এমন মানুষরা যাতে প্রমোশন পেয়ে বড় পদে না যেতে পারেন এ কারণে মোহাম্মাদ আসাদুর রহমান গংরা প্রমোশনের পুরো সিস্টেম পরিবর্তন করে প্রমোশনের পুরো বিষয়টিকে খেলতামাসার বিষয়ে পরিণত করেছেন।
বার্ষিক ইনক্রিমেন্টের বিষয়েও তার নগ্ন হস্তক্ষেপ চোখে পড়ার মতো। কেপিআই-ভিত্তিক ইনক্রিমেন্ট চালু করার পর থেকে প্রথমদিকে লম্বা একটা সময় তার অনুগতরা যোগ্য না হলেও পাঁচে পাঁচ পেয়ে অনেক বেশি ইনক্রিমেন্ট পেয়ে বেতন-ভাতায় এগিয়ে আছেন। ২০২৫ সালের জুন মাস শেষে ডিএসইর প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা ও ভারপ্রাপ্ত এমডির দায়িত্ব পাওয়ার পর নিজের একচ্ছত্র রাজত্ব কায়েম করার পর প্রতিষ্ঠানের সবকিছুর ওপর এমনভাবে নিয়ন্ত্রণ নিয়েছেন যে উনার সম্মতি ছাড়া কোনো কাজ করা অসম্ভব।
খরচ কমানোর নামে অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এড়িয়ে যাওয়ার কারণে প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘমেয়াদি যে ক্ষতি হচ্ছে তার তো কোনো হিসাব নেই বিশেষ করে মানবসম্পদ উন্নয়নে। ঠিক একই সময়ে প্রভাবশালী পরিচালকদেরকে খুশি করার জন্য অপ্রয়োজনীয় লোক নিয়োগ দেয়ার কাজ চলমান আছে।
ইন্টারনাল অডিট ডিপাটমেন্টের মতো জায়গায় যেখানে সারাজীবন দুইজন মানুষে ভালোভাবে চলত সেখানে বর্তমানে মহাব্যবস্থাপক, উপ-মহাব্যবস্থাপক, সহকারী মহাব্যবস্থাপক, ব্যবস্থাপক ও নতুন নিয়োগ পাওয়া দুইজন-সহ তিনজন সিনিয়র এগজিকিউটিভরা দায়িত্ব পালন করছেন। সম্প্রতি ইন্টারনাল অডিট ডিপাটমেন্টে আরো দুইজন সিনিয়র এগজিকিউটিভ নিয়োগ দেয়া হয়েছে।
অথচ প্রতিষ্ঠানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুই পদ যেমন সিআরও ও কোম্পানি সেক্রেটারি পদ মূলত ফাঁকা। মোহাম্মাদ আসাদুর রহমান কোম্পানি সেক্রেটারির পদ ছেড়ে নতুন পদে গেলেও নিজের অনুগত লোক বসিয়ে কোম্পানি সেক্রেটারির পদও নিজে আগলে রেখেছেন। সিআরও পদে নিজের আরেক অনুগতকে বসিয়ে সেখানেও যোগ্য লোক নিয়োগের পথে বড় বাধা হিসেবে কাজ করছেন।
জানা গেছে গত আর্থিক বছরের জন্য স্টক এক্সচেঞ্জের স্টাফরা কোনো ইনক্রিমেন্ট বা প্রমোশন পায়নি এবং বিভিন্ন লেভেলের কর্মকর্তাদের সাথে মিটিংয়ে বর্তমান বলে দিয়েছেন যে জুন মাসে শেষ হতে যাওয়া আর্থিক বছরেও কোনো ইনক্রিমেন্ট দেয়া হবে না।
যত হিসাব তা হয় শুধুমাত্র স্টাফদের বেতন-ভাতা বাড়ানোর সময়। সবকিছু ঠিকঠাক চললেও বেতন-ভাতা বাড়ানোর দিকে মনোযোগ না থাকায় মনোবলহীন ও হতদ্যোম হয়ে পড়ছেন বেশিরভাগ স্টাফ যার প্রভাবে দিন দিন প্রতিষ্ঠানটির মান নামতে নামতে তলানিতে চলে গিয়েছে। অন্যদিকে লোকবল ছাঁটাইয়ের আতঙ্কে বেশিরভাগ স্টাফ কাজে মনোনিবেশ করতে পারছেন না।
শেয়ারবাজার ভালোর দিকে যাচ্ছে। এমন সময় ছাঁটাইয়ের দিকে মনোযোগ না দিয়ে সবার উচিত ছিল প্রতিষ্ঠানটিকে সামনে এগিয়ে নেয়া কিন্তু কে নিবে? মোহাম্মাদ আসাদুর রহমানরা তো জগদ্দল পাথরের মতো চেপে বসেছেন সব ভালো পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পথের প্রধান প্রতিবন্ধকতা হিসেবে।













