নিজস্ব প্রতিবেদক: ভূমি উন্নয়ন কর (খাজনা) আদায় বাড়াতে মাঠপর্যায়ে বিশেষ অভিযান শুরু করতে যাচ্ছে সরকার। বকেয়া কর আদায়ে বড় ভূমি মালিকদের বিরুদ্ধে লাল নোটিশ জারি, প্রয়োজনে সার্টিফিকেট মামলা দায়ের, গ্রাম ও হাটবাজারে ক্যাম্প পরিচালনা এবং কর আদায়ে মাঠ প্রশাসনের তৎপরতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
ভূমি মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, সাম্প্রতিক সময়ে ভূমি উন্নয়ন কর আদায়ের হার, বকেয়ার পরিমাণ এবং বিভিন্ন এলাকার আদায় পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে বেশ কিছু নির্দেশনা দেওয়ার প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে কর আদায়ের ক্ষেত্রে মাঠপর্যায়ে আরও সক্রিয় ভূমিকা পালনের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ইতোমধ্যে সকল বিভাগীয় কমিশনার ও জেলা প্রশাসকদের নির্দেশ দিয়েছে সরকার।
মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের মতে, প্রত্যেক মৌজায় কয়েকজন প্রভাবশালী ও বৃহৎ ভূমি মালিকের কাছ থেকে কর আদায় নিশ্চিত করা গেলে অন্য করদাতাদের মধ্যেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। সে কারণে বকেয়া করদাতাদের বিরুদ্ধে লাল নোটিশ জারি এবং প্রয়োজন হলে সার্টিফিকেট মামলা দায়েরের বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে। এ সংক্রান্ত বৈঠকে কর পরিশোধের সঙ্গে ভূমিসেবার সমন্বয়ের বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। কর বকেয়া থাকলে জমি বিক্রি, হস্তান্তর বা বন্ধক রাখা এবং ভবনের নকশা অনুমোদনের ক্ষেত্রে বিদ্যমান বিধিনিষেধ কঠোরভাবে অনুসরণের বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে। একই সঙ্গে নামজারি সম্পন্ন করার আগে ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধ নিশ্চিত করার বিষয়েও নির্দেশনা আসতে পারে।
এ সংক্রান্ত নথিতে দেখা গেছে, সর্বমোট কর দাবি ৭৮৫৩ কোটি ৩৭ লাখ ৬৪ হাজার ৯৬৭ টাকা। এর মধ্যে আদায় হয়েছে মাত্র ৯১৪ কোটি ৩২ লাখ, ৬২ হাজার ৭৭৫ টাকা। আর বকেয়া রয়েছে ৬৯৩৯ কোটি ৫ লাখ ২ হাজার ১৯২ টাকা। এর মধ্যে সাধারণ পর্যায়ে ৬৩৮২ কোটি ৩১ লাখ ৬১ হাজার ৪৮৯ টাকা এবং সংস্থা পর্যায়ে রয়েছে ৫৫৬ কোটি ৭৩ লাখ ৪০ হাজার ৭০৩ টাকা বকেয়া রয়েছে।
ভূমি উন্নয়ন কর সাধারণ পর্যায়ে আদায়ের মধ্যে ঢাকা বিভাগে ১১ শতাংশ, ময়মনসিংহ বিভাগে ১০ শতাংশ, খুলনা বিভাগে ৬ শতাংশ, রংপুর বিভাগে ৬ শতাংশ, রাজশাহী বিভাগে ১২ শতাংশ, চট্টগ্রাম বিভাগে ১৩ শতাংশ, সিলেট বিভাগে ৯ শতাংশ ও বরিশাল বিভাগে ১৭ শতাংশ আদায় করা হয়েছে।
ভূমি উন্নয়ন করের ক্ষেত্রে আদায়ের হার কম ঢাকা, সাতক্ষীরা, চট্টগ্রাম, সিলেট, রংপুর, গাজীপুর, কুমিল্লা, নারায়ণগঞ্জ ও যশোর জেলায়। আর তুলনামূলক কর আদায় বেশি হয়েছে ১০ জেলাÑ বরগুনা, পঞ্চগড়, মাগুরা, ঝালকাঠি, গোপালগঞ্জ, ভোলা, মুন্সীগঞ্জ, ঠাকুরগাঁও, মাদারীপুর ও মেহেরপুরে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, ভূমি ব্যবস্থাপনা ম্যানুয়ালের নির্দেশনা অনুযায়ী গ্রামাঞ্চলে বিশেষ ক্যাম্প, হাটবাজারে ভ্রাম্যমাণ অফিস এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সম্পৃক্ত করে করদাতাদের উদ্বুদ্ধ করার উদ্যোগ নেওয়া হবে। পাশাপাশি গণবিজ্ঞপ্তি, মাইকিং, সামাজিক মাধ্যমে প্রচার এবং লিফলেট বিতরণের মাধ্যমেও সচেতনতা বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
এ বিষয়ে ভূমিমন্ত্রী মিজানুর রহমান মিনু গতকাল এক কর্মশালায় বলেন, অতীতে জোর করে কর আদায় করে সাম্রাজ্য বিস্তার করত, টিকিয়ে রাখত। এখন গণতান্ত্রিক সরকার। আধুনিক সভ্যতায় নাগরিকরা এবং প্রতিষ্ঠান করের মাধ্যমে আধুনিক রাষ্ট্র পরিচালনায় অবদান রাখে। ব্যক্তি ও সরকারি প্রতিষ্ঠানের উচিত নিয়মিত কর দেওয়া। কারণ দেশ পরিচালনায় অর্থের জোগানের দরকার হয়।
মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, কর আদায়ে প্রথমে সচেতনতা বৃদ্ধিতে জোর দিয়েছে সরকার। ব্যক্তি ও সরকারি প্রতিষ্ঠান উভয় ক্ষেত্রেই কর না দেওয়ার প্রবণতা রয়েছে। অনেকে জমির নামজারি করছেন না। ফলে তৈরি হয়নি হোল্ডিং নম্বর। সংস্থা ও ব্যক্তি উভয় পর্যায়ে উদ্বুদ্ধ করা হবে।
তথ্যমতে, অনেক সরকারি প্রতিষ্ঠান জমি অধিগ্রহণ করেছে; কিন্তু নামজারি করেনি। আবার কিছু প্রতিষ্ঠানে বাজেট বরাদ্দ না থাকার কথা শোনা যায়। বাজেটে এ সংক্রান্ত অর্থ সংস্থানের বিষয়টি তুলে করতে প্রত্যেক মন্ত্রণালয় ও প্রতিষ্ঠানকে উদ্যোগী হতে হবে। তবে স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের বাজেট সমস্যা নেই। তাদের সচেতন করা হবে। জমির কর না দিলে তা খাসজমি হয়ে যাওয়ার আশঙ্কার বিষয়টি প্রচারের কথা আলোচনা হয়েছে এ সংক্রান্ত বৈঠকে। অর্থাৎ জমির কর না দিলে সরকার কঠোরভাবে আইন প্রয়োগ করলে জমি খাস হয়ে যাওয়ার আশঙ্কাটি প্রচারে তুলে ধরা হবে।
সূত্রগুলো জানায়, ভূমি উন্নয়ন কর ব্যবস্থাপনায় সেবার গতি বাড়ানোর উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে। নতুন হোল্ডিং খোলার আবেদন যাচাইয়ের পর ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে নিষ্পত্তি, মালিকানা পরিবর্তন ও রেকর্ড দ্রুত হালনাগাদের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হবে। আদায় মৌসুমে ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা, উপ-সহকারী কর্মকর্তা ও তহশিলদারদের মাঠপর্যায়ে আরও বেশি সময় অবস্থান নিশ্চিত করার বিষয়েও আলোচনা হতে পারে। প্রয়োজনে অন্যান্য শাখা থেকে অস্থায়ীভাবে জনবল এনে আদায় কার্যক্রমে যুক্ত করার প্রস্তাবও বিবেচনায় রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, শুধু আইনগত ব্যবস্থা নয়, করদাতাদের মধ্যে ইতিবাচক মনোভাব তৈরিতেও জোর দেওয়া হবে। এ জন্য নিয়মিত ও বড় করদাতাদের প্রশাসনের পক্ষ থেকে স্বীকৃতি বা পুরস্কার দেওয়ার প্রস্তাবও আলোচনায় রয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, ভূমি উন্নয়ন কর আদায় পুরোপুরি অনলাইনে নেওয়ার ঘোষণা এসেছিল ২০২৩ সালের ১৩ এপ্রিল। সেই সময় ভূমি মন্ত্রণালয় নির্দেশনা দিয়েছিল, ভূমি মালিক অনলাইনে আবেদন করার সাত কার্যদিবসের মধ্যে হোল্ডিং যাচাই ও অনুমোদন করতে হবে। দেশের সব হোল্ডিংয়ের দাবি অনলাইনে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। বন্ধ করতে হবে কাগজের দাখিলার ব্যবহারও। তবে তিন বছর পেরিয়ে গেলেও অনেক এলাকায় এখনও পুরোপুরি বাস্তবায়ন হয়নি সেই নির্দেশনা। মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এখনও বহু এলাকায় পুরনো রেকর্ড, মালিকানার অসঙ্গতি, তথ্য হালনাগাদের ধীরগতি এবং জনবল সংকটের কারণে অনেক হোল্ডিং সম্পূর্ণভাবে অনলাইন ব্যবস্থার আওতায় আনা সম্ভব হয়নি।
একজন সহকারী কমিশনার (ভূমি) নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, অনলাইন সিস্টেম চালু হওয়ার ফলে স্বচ্ছতা বেড়েছে। কিন্তু বহু এলাকায় রেকর্ডের সঙ্গে জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্যের অমিল, উত্তরাধিকারজনিত জটিলতা এবং পুরনো খতিয়ানের কারণে কাজের চাপও অনেক বেড়েছে।













